সূচিপত্র

    পোশাক নিয়ে কিছু কথা

    য়তান সবচেয়ে বেশি মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে পোশাক খোলার মাধ্যমে। এজন্যই সে সর্বপ্রথম আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম থেকে পোশাক ছিনিয়ে নিয়েছে। 

    বর্তমানে আমরা যদি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো মানুষের পোশাক ঠিক নেই। মেয়েরা উলঙ্গ অথবা অর্ধ উলঙ্গ আর পুরুষরা আপাদমস্তক ঢাকা। অথচ কথা ছিল নারীদের আপাদমস্তক ঢাকা থাকবে আর পুরুষদের প্যান্ট থাকবে টাখনুর উপরে। কিন্তু আমরা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি। 
    মানুষের পোশাক দুই প্রকার। বাহ্যিক পোশাক ও অভ্যন্তরীণ পোশাক। বাহ্যিক পোশাক আবার দুই প্রকার। জরুরী ও কামালী। জরুরী পোশাক হচ্ছে, লজ্জাস্তান ঢেকে রাখতে যতটুকু পোশাকের প্রয়োজন ততটুকু পোশাক। আর কামালী পোশাক হচ্ছে, লজ্জাস্তান ঢাকার পর আরো অতিরিক্ত যে পোশাক পরিধান করা হয় তা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,

    ﴿يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ﴾
    “হে আদম সন্তানগণ! আমি তোমাদের উপর পোশাক অবতীর্ণ করেছি—যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকে, আর ‘রিশা’ (শোভা-সৌন্দর্যের পোশাক); আর তাকওয়ার পোশাক—সেটাই উত্তম।” (সূরা আরাফ, ৭/২৬)।
    উপরের আয়াতে يُوَارِي سَوْآتِكُمْ হচ্ছে জরুরী পোশাক আর وَرِيشًا হচ্ছে কামালী পোশাক। আরো একটি আয়াত দেখুন,

    ﴿يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِد

    “হে আদম সন্তানগণ! প্রত্যেক সালাতের সময় (বা মসজিদে যাওয়ার সময়) তোমরা তোমাদের শোভা-সৌন্দর্য (উপযুক্ত পোশাক) গ্রহণ করো।”(সূরা আরাফ, ৭/৩১)।
    উপরের আয়াতে زِينَتَكُمْ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কামালী পোশাক। জরুরী পোশাক উদ্দেশ্য নয়। কারণ কেউ শুধু লজ্জা স্থান ঢেকে মসজিদে যায় না। বরং আরো অতিরিক্ত কিছু পরে তারপর মসজিদে যায়। যেমন লুঙ্গি পরে, পাঞ্জাবি পরে অথবা গেঞ্জি পরে অথবা শার্ট পরে অথবা কোর্ট পরে ইত্যাদি কাপড় পরিধান করে মসজিদে যায়।
    আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর মাঝে সকল জীবজন্তুর উপর মানুষদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আল্লাহ বলেন, 
    ﴿وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا﴾

    “নিশ্চয়ই আমরা আদম-সন্তানকে সম্মানিত করেছি; স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের ব্যবস্থা করেছি; তাদেরকে উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমাদের সৃষ্ট বহু কিছুর ওপর তাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছি।” (সূরা,বনী ইসরাইল, ১৬/৭০)।
    ﴿لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ﴾
    “নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা তীন, ৯৫/৪)।
    এজন্যই আল্লাহ তাআলা প্রাণীদের জন্য নির্ধারণ করেছেন জরুরি পোশাক তথা লজ্জাস্থান ঢাকা পরিমান পোশাক। আর মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন কামালী পোশাক তথা লজ্জাস্থান ঢাকা পরিমানের চেয়ে আরো বেশি পোশাক। 

    এখানে চিন্তাভাবনার বিষয় রয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য উত্তম পোশাক কামালী পোশাক নির্ধারণ করেছেন। আমরা দেখতে পাই কিছু মানুষ এই কামালী পোশাক গ্রহণ না করে জরুরী পোশাক তথা জীবজন্তুর পোশাক গ্রহণ করেছে। তারা পশুর চেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য কামালী পোশাক নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তারা তা গ্রহণ না করে জীবজন্তুর পোশাক গ্রহণ করেছে। এদিকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, 
    ﴿أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ﴾
    “তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট। তারাই হলো গাফেল।” (সূরা আরাফ, ৭/১৭৯)।
    লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা জীবজন্তুকে জ্ঞান দেন নি। কিন্তু মানুষদেরকে জ্ঞান দিয়েছেন। জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সে তার উত্তম পোশাক গ্ৰহণ না করে জীবজন্তুর পোশাক গ্রহণ করেছে। এজন্যই আল্লাহ তাআলা তাকে নিকৃষ্ট বলেছেন। 
    অভ্যন্তরীণ পোশাক হচ্ছে তাকওয়া। বাহ্যিক পোশাক এবং অভ্যন্তরীণ পোশাক এই দুই পোশাকের মধ্যে উত্তম পোশাক হচ্ছে অভ্যন্তরীণ পোশাক। এজন্যই আল্লাহ তাআলা আয়াতের মধ্যে هذا না বলে ذلك বলেছেন। আয়াতটি একটু লক্ষ্য করুন,
    وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ
    তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে উত্তম পোশাক।(সূরা আরাফ, ৭/২৬)।
    এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা هذا এর স্থানে ذلك ব্যবহার করেছেন। এর কারণ হচ্ছে هذا এর স্থানে ذلك ব্যবহার করা হয় মূলত মর্যাদা বুঝানোর জন্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
    الم ۚ ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ ۛ

    “আলিফ-লাম-মীম। এই কিতাবের মাঝে কোনো সন্দেহ অবকাশ নেই । (সূরা বাকারা, ২/১)।
    এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা هذا এর স্থানে ذلك ব্যবহার করেছেন কুরআনের মর্যাদা বুঝানোর জন্য। অনুরূপভাবে উপরের আয়াতের মধ্যে অভ্যন্তরীণ পোশাক তথা তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে বাহ্যিক পোশাক থেকে উত্তম। 

    কোনো ব্যক্তির যদি অভ্যন্তরীণ পোশাক নষ্ট হয়ে যায় তথা তাকওয়া নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এর প্রতিক্রিয়া বাহ্যিকভাবেও পরে। 

    উপরে বর্ণিত দুটি পোশাক একটি আরেকটা সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি নষ্ট হয়ে গেলে অটোমেটিক আরেকটি নষ্ট হয়ে যাবে। দলিল দেখুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন,
    إِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً، إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، قُلُوبُهَا الْقَلْبُ
    “নিশ্চয়ই মানুষের শরীরে একটি মাংসের টুকরো (মণ্ড) আছে, যদি তা ঠিক থাকে, সব শরীর ঠিক থাকে; আর যদি তা নষ্ট হয়, সব শরীর নষ্ট হয়—এটি হলো কলব (হৃদয়)।” (বুখারী, হা/২১৮৬)।

    আরেকটি উদাহরণ দেখুন, রমজানে সিয়াম রাখলে আমাদের তৃষ্ণা লাগে। এরপর যখন আমরা গোসল করি তখন খানিকটা তৃষ্ণা নিবারণ হয়ে যায়। এর কারণ জানেন কি? এর কারণ হচ্ছে, আপনার অন্তর গরম হয়ে গেছে এই জন্য তৃষ্ণা লেগেছে। যখনই আপনি বাহ্যিকভাবে আপনার শরীরের মধ্যে পানি ঢাললেন তথা গোসল করলেন তখন এর প্রতিক্রিয়া আপনার অন্তরের মধ্যে লেগেছে। যার কারণে এখন আপনার তৃষ্ণা খানিকটা নিবারণ হয়েছে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন। 

    এখন শুনুন, এই অভ্যন্তরীণ পোশাক তথা তাকওয়ার পোশাক কিভাবে নষ্ট হয়ে যায় অথবা ছিড়ে যায়? এই পোশাক নষ্ট হয়ে যায় অথবা ছিড়ে যায় পাপ কাজ করলে। এজন্যই আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম যখন আল্লাহর কথা অমান্য করে নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন তখন তাদের পোশাক খুলে গেছে। কথা হচ্ছে ফল খাওয়ার কারণে তাদের পোশাক খুলে গেল কেন? আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কারণে তাদের পাপ হয়েছে। পাপ হওয়ার ফলে তাদের অভ্যন্তরীণ পোশাক তথা তাকওয়ার পোশাক খুলে গেছে। এজন্য তাদের বাহ্যিক পোশাকও খুলে গেছে। 
    আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মিরাজে গিয়েছিলেন তখন ফেরেশতা জিব্রাইল তাকে মদ এবং দুধ দিয়েছিলেন পান করার জন্য। তিনি মদগ্রহণ না করে দুধ গ্রহণ করেছিলেন। যদি তিনি মদ গ্রহণ করতেন তাহলে তার অভ্যন্তরীণ পোশাক তথা তাকওয়ার পোশাক নষ্ট হয়ে যেত। যার ফলে তার উম্মতর বিপথগামী হতো। 

    আভ্যন্তরীণ পোশাক তথা তাকওয়ার পোশাক ঠিক রাখার উপায় কী?
    আভ্যন্তরীণ পোশাক তথা তাকওয়ার পোশাক ঠিক রাখার উপায় হচ্ছে, আমাদের কোনো গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে তাহলে এই পোশাক ঠিক থাকবে। নচেৎ নষ্ট হয়ে যাবে অথবা ছিড়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
    وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ ۖ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ
    “আর যারা যখন কোনো জঘন্য পাপ করে, বা নিজের উপর অন্যায় করে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। কে তাদের পাপ ক্ষমা করতে পারে যদি না আল্লাহ? এবং তারা সেই কাজের ওপর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী হয় না।” (সূরা মুমিনুন, ২৩/৭)।
    পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবো তিনি যেন আমাদের অভ্যন্তরীণ পোশাক তথা তাকওয়ার পোশাক এবং বাহ্যিক পোশাক উভয়টিকে রক্ষা করার তাওফিক দান করেন আমীন।


    Next Post Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url