সূচিপত্র

    দন্ডবিধি


    দ (দন্ডবিধি) কাকে বলে? নির্দিষ্ট অপরাধের কারণে শরীয়াত কতৃক নির্ধারিত শাস্তি কে হদ তথা দন্ডবিধি বলে। হদ (দন্ডবিধি) কার্যকর করার হিকমাহ আমাদের দেশে প্রতি নিয়ত অন্যায় অপকর্ম ও অপরাধ হচ্ছে। এর কারণটা জানেন কি? এর কারণ হচ্ছে, আমরা অপরাধীদের উপর হদ (দন্ডবিধি) কার্যকর করি না। এজন্য অপরাধীরা আস্কারা পেয়ে দিনদিন অপরাধ করে যাচ্ছে। আমরা হাজার চেষ্টা তদবির করেও অপরাধ বন্ধ করতে পারছি না। আমরা যদি ইসলামী বিধান অনুযায়ী একটি বিচার করতে পারি তাহলে সহজেই অপরাধীদেরকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারবো। এদিকে লক্ষ্য করেই আল্লাহ তাআলা বলেন, وَ لَكُمۡ فِی الۡقِصَاصِ حَیٰوۃٌ یّٰۤاُولِی الۡاَلۡبَابِ আর হে বিবেকসম্পন্নগণ! কিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন। (সূরা বাকারা, ২/১৭৯)। এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, কিসাসের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন। অথচ আমরা জানি একটা ব্যক্তিকে কিসাস করা হলে তার জীবন নাশ হয়। এখানে হিকমাহ হচ্ছে, কেউ কাউকে হত্যা করলে যদি জনসম্মুখে এর কিসাস নেয়া হয় তাহলে অন্যান্য মানুষ কাউকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকবে। এটাকেই আল্লাহ জীবন বলেছেন। বর্তমানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বিনা কারণে, বিনা দোষে অন্যায় ভাবে হত্যা করে। যদি জনসম্মুখে এর বিচার হতো তাহলে কেউ কাউকে কখনো অন্যায় ভাবে হত্যা করতো না। হত্যা করার আগে ১০০ বার চিন্তা ভাবনা করতো। اَلزَّانِیَۃُ وَ الزَّانِیۡ فَاجۡلِدُوۡا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنۡهُمَا مِائَۃَ جَلۡدَۃٍ ۪ وَّ لَا تَاۡخُذۡكُمۡ بِهِمَا رَاۡفَۃٌ فِیۡ دِیۡنِ اللّٰهِ اِنۡ كُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۚ وَ لۡیَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَۃٌ مِّنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে বেত্রাঘাত করো। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক তবে আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে। আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (সূরা নূর,২৪/২)। উপরোক্ত আয়াতের প্রতি লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা এখানে কিছু মানুষকে ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর শাস্তি প্রত্যক্ষ করার জন্য বলেছেন। সাথে সাথে একথাও বলেছেন শাস্তি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মায়া মমতা যেন কাউকে পেয়ে না বসে। অর্থাৎ বিচারক অথবা শাস্তিদাতা ব্যক্তি শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মায়া মমতা দেখাবে না। বর্তমানে আমরা ধর্ষণ ব্যভিচার বন্ধে নানান চেষ্টা-প্রচেষ্টা করছি। পেপার পত্রিকায় লেখালেখি করছি, মানববন্ধন করছি। এত কিছু করার পরেও ব্যভিচার কি বন্ধ হয়েছে, ধর্ষণ কি বন্ধ হয়েছে? হয়নি। এর কারণ কি? এর কারণ হচ্ছে ধর্ষককে জনসম্মুখে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। সে ধর্ষণ করেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। দিব্যি পুলিশের নাকের ডগার সামনে দিয়ে চলাফেরা করছে। কোনো ধর্ষককে যদি জনসম্মুখে পাথর মেরে হত্যা করা হতো অথবা বেত্রাঘাত করা হতো তাহলে কেউ ব্যভিচার এবং ধর্ষণের দিকে ধাবিত হতো না। ধর্ষণ করার আগে ১০০ বার চিন্তা ভাবনা করতো। উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম দন্ডবিধিকার্যকর করা হলে মানুষের জীবন নাশ হয় না। বরং হাজারো মানুষ অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে। দন্ডবিধি কার্যকর করার গুরুত্ব নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‎ حَدٌّ يُعْمَلُ بِهِ فِي الأَرْضِ خَيْرٌ لأَهْلِ الأَرْضِ مِنْ أَنْ يُمْطَرُوا أَرْبَعِينَ صَبَاحًا ‏"‏ ‏.‏ কোনো জনপদে একটি হদ কার্যকর করা সেই জনপদে চল্লিশ দিন বৃষ্টিপাত হওয়ার তুলনায় উত্তম। (ইবনু মাজাহ, হা/২৫৩৮)। পানি ছাড়া কোনো প্রাণীই বাঁচে না। এই পানির উৎস হচ্ছে বৃষ্টি। বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করে। আর সেখান থেকেই মটর অথবা টিউবওয়েলের মাধ্যমে আমরা পানি উঠাই। ওই পানি খেয়েই প্রতিটি প্রাণী বেঁচে থাকে। হাদিসে বলা হয়েছে ৪০ দিন বৃষ্টি হওয়ার চেয়ে দন্ডবিধিকার্যকর করা উত্তম। বিষয়টি কত গুরুত্বপূর্ণ তা এই হাদীস থেকে সহজেই অনুমেয়। দন্ডবিধি কার্যকর করার বিধান দন্ডবিধি কার্যকর করা ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, اَلزَّانِیَۃُ وَ الزَّانِیۡ فَاجۡلِدُوۡا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنۡهُمَا مِائَۃَ جَلۡدَۃٍ ۪ ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে বেত্রাঘাত করো। (সূরা নূর,২৪/২) এই আয়াতের মধ্যে فَاجۡلِدُوۡا আমর (আদেশ) এর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আর আমর (আদেশ) এটা ওয়াজিব বুঝায়। সুতরাং দন্ডবিধি কার্যকর করার ফরজ ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَ السَّارِقُ وَ السَّارِقَۃُ فَاقۡطَعُوۡۤا اَیۡدِیَهُمَا পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও। (সূরা মায়েদা, ৫/৩৮) এই আয়াতের মধ্যে فَاقۡطَعُوۡۤا আমর (আদেশ) এর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আর আমর (আদেশ) এটা ওয়াজিব বুঝায়। সুতরাং দন্ডবিধি কার্যকর করার ফরজ ওয়াজিব। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন, عَنَ عَائِشَةَ، أَنَّ قُرَيْشًا، أَهَمَّهُمْ شَأْنُ الْمَرْأَةِ الْمَخْزُومِيَّةِ الَّتِي سَرَقَتْ فَقَالُوا مَنْ يُكَلِّمُ فِيهَا رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالُوا وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلاَّ أُسَامَةُ حِبُّ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ ‏"‏ ‏.‏ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ فَقَالَ ‏"‏ أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا ‏"‏ ‏.‏ মাখযুমী গোত্রের একজন মহিলা চুরি করলে তার (প্রতি হদ প্রয়োগের ব্যাপারে) কুরাইশগণ বিভক্ত হয়ে পড়লেন। তাঁরা বললো, কে এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কথা বলতে (সুপারিশ করতে) পারে। তখন তারা বললেন, এ ব্যাপারে উসামা রাদিআল্লাহু আনহু ব্যতীত আর কারো হিম্মত নেই। তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় ব্যক্তি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তিনি এ ব্যাপারে কথোপকথন করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হদের ব্যপারে সুপারিশ করতে চাও? অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেনঃ হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগন ধ্বংস হয়েছে এই কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোন সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করতো, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যদি কোন দুর্বল লোক চুরি করত, তবে তারা তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করতো। আল্লাহর কসম! যদি ফাতিমা বিনত মুহাম্মদও যদি চুরি করতো, তবে নিশ্চয়ই আমি তার হাত কেটে দিতাম। মুসলিম, হা/৪২৬৩। ‎নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, أَقِيمُوا حُدُودَ اللَّهِ فِي الْقَرِيبِ وَالْبَعِيدِ وَلاَ تَأْخُذْكُمْ فِي اللَّهِ لَوْمَةُ لاَئِمٍ ‏"‏ ‏.‏ তোমরা কাছের ও দুরের সকলের উপর আল্লাহ নির্ধারিত হদ্দ কার্যকর করো। আল্লাহর কাজে কোনো সমালোচকের সমালোচনা যেন তোমাদের বিব্রত না করে। ইবনু মাজাহ, হা/ ২৫৪০। উপরের দুটি হাদীস প্রমাণ করে দন্ডবিধি কার্যকর করার ফরজ ওয়াজিব। উমার রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, বিবাহিত অবস্থায় কেউ যিনা করলে তাকে রজম করা ওয়াজিব। ফাতহু যিল জালালি ওয়াল ইকরাম, ৫/৩৩০। ইবনু উসাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেন, দন্ডবিধি কার্যকর করা ফরজ ওয়াজিব। ফাতহু যিল জালালি ওয়াল ইকরাম, ৫/৩৩০। সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম অবশ্যই দন্ডবিধি কার্যকর করতে হবে এবং এটা কার্যকর করা ফরজ। বিচারকের কাছে দন্ড চলে গেলে সুপারিশ করা যাবে না বিচারকের কাছে যদি দন্ডবিধে চলে যায় তাহলে কারো জন্য জায়েয নয় শাস্তি না দেয়ার জন্য বিচারকের কাছে সুপারিশ করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‎"‏ مَنْ حَالَتْ شَفَاعَتُهُ دُونَ حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ فَقَدْ ضَادَّ اللَّهَ وَمَنْ خَاصَمَ فِي بَاطِلٍ وَهُوَ يَعْلَمُهُ لَمْ يَزَلْ فِي سَخَطِ اللَّهِ حَتَّى يَنْزِعَ عَنْهُ وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِنٍ مَا لَيْسَ فِيهِ أَسْكَنَهُ اللَّهُ رَدْغَةَ الْخَبَالِ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ ‏"‏ ‏.‏ যার সুপারিশ আল্লাহর নির্ধারিত কোন হাদ্দ বাস্তবায়িত করার পথে বাধা সৃষ্টি করে, সে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। যে ব্যক্তি জেনে বুঝে মিথ্যা মামলা দেয়, সে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত আল্লাহর অসন্তুষ্টি দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। যে ব্যক্তি কোন ঈমানদারের এমন দোষ বলে বেড়ায় যা তার মধ্যে নেই, আল্লাহ তাকে জাহান্নামীদের আবর্জনার মধ্যে বসবাস করাবেন। অতএব তাকে শিঘ্রই তার কথা হতে তাওবাহ এবং ত্যাগ করা উচিত। সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৫৯৭ একটা ঘটনা ঘটেছিল মক্কায়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম কি বলেছিলেন শুনুন, আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন, عَنَ عَائِشَةَ، أَنَّ قُرَيْشًا، أَهَمَّهُمْ شَأْنُ الْمَرْأَةِ الْمَخْزُومِيَّةِ الَّتِي سَرَقَتْ فَقَالُوا مَنْ يُكَلِّمُ فِيهَا رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالُوا وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلاَّ أُسَامَةُ حِبُّ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ ‏"‏ ‏.‏ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ فَقَالَ ‏"‏ أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا ‏"‏ ‏.‏ মাখযুমী গোত্রের একজন মহিলা চুরি করলে তার (প্রতি হদ প্রয়োগের ব্যাপারে) কুরাইশগণ বিভক্ত হয়ে পড়লেন। তাঁরা বললো, কে এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কথা বলতে (সুপারিশ করতে) পারে। তখন তারা বললেন, এ ব্যাপারে উসামা রাদিআল্লাহু আনহু ব্যতীত আর কারো হিম্মত নেই। তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় ব্যক্তি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তিনি এ ব্যাপারে কথোপকথন করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হদের ব্যপারে সুপারিশ করতে চাও? অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেনঃ হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগন ধ্বংস হয়েছে এই কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোন সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করতো, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যদি কোন দুর্বল লোক চুরি করত, তবে তারা তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করতো। আল্লাহর কসম! যদি ফাতিমা বিনত মুহাম্মদও যদি চুরি করতো, তবে নিশ্চয়ই আমি তার হাত কেটে দিতাম। মুসলিম, হা/৪২৬৩। ইসলাম কখনো স্বজনপ্রীতি, দল প্রীতি, গোত্রপ্রীতি, সংগঠন প্রীতিকে সাপোর্ট করে না। ইসলাম বলে অপরাধী সে যেই হোক তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমাদের বর্তমান সমাজে গরিবের মেয়ে ধর্ষিতা হলে বিচার পায় না। কেন পায় না? কারণ ধর্ষক অমুক দলের নেতা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে পুলিশরা মামলা পর্যন্ত নিতে চায় না, বিচার হওয়া তো দূরের কথা। এগুলো ইহুদীদের রীতি। তাদের মাঝে ধনী ব্যক্তি অপরাধ করলে শাস্তি পেত না। কিন্তু একই অপরাধ গরিব মানুষ করলে শাস্তি পেত। ইসলাম হচ্ছে মানবতার ধর্ম। এখানে সবাই সমান। এখানে রয়েছে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার মেয়ে ফাতেমা চুরি করলেও আমি নিজে তার হাত কেটে দিবো। মুসলিম, হা/৪২৬৩। এটাই হচ্ছে প্রকৃত ইসলাম। সুতরাং বিচারকের কাছে বিচার পৌঁছে গেলে আমরা কেউ শাস্তি না দেয়ার জন্য বিচারকের কাছে সুপারিশ করবো না। তাহলে আল্লার বিধান লঙ্ঘিত হবে। তবে হ্যাঁ, বিচারকের কাছে পৌছার আগে যদি বিষয়টা সুপারিশ করার মাধ্যমে সমাধা করা যায় তাহলে সুপারিশ করবেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‎ ‏ "‏ تَعَافَوُا الْحُدُودَ فِيمَا بَيْنَكُمْ فَمَا بَلَغَنِي مِنْ حَدٍّ فَقَدْ وَجَبَ ‏"‏ ‏.‏ তোমরা আপসে তোমাদের মধ্যে সংঘটিত হদ্দ সংশ্লিষ্ট অপরাধ গোপন রাখো। অন্যথায় তা আমার নিকট পৌঁছালে তার শাস্তি বাস্তবায়িত হবেই। আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৩৭৬ ، قَالَ كُنْتُ نَائِمًا فِي الْمَسْجِدِ عَلَى خَمِيصَةٍ لِي ثَمَنُ ثَلاَثِينَ دِرْهَمًا فَجَاءَ رَجُلٌ فَاخْتَلَسَهَا مِنِّي فَأُخِذَ الرَّجُلُ فَأُتِيَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَمَرَ بِهِ لِيُقْطَعَ ‏.‏ قَالَ فَأَتَيْتُهُ فَقُلْتُ أَنَقْطَعُهُ مِنْ أَجْلِ ثَلاَثِينَ دِرْهَمًا أَنَا أَبِيعُهُ وَأُنْسِئُهُ ثَمَنَهَا قَالَ ‏ "‏ فَهَلاَّ كَانَ هَذَا قَبْلَ أَنْ تَأْتِيَنِي بِهِ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَرَوَاهُ زَائِدَةُ عَنْ سِمَاكٍ عَنْ جُعَيْدِ بْنِ جُحَيْرٍ قَالَ نَامَ صَفْوَانُ ‏.‏ وَرَوَاهُ مُجَاهِدٌ وَطَاوُسٌ أَنَّهُ كَانَ نَائِمًا فَجَاءَ سَارِقٌ فَسَرَقَ خَمِيصَةً مِنْ تَحْتِ رَأْسِهِ ‏.‏ وَرَوَاهُ أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ قَالَ فَاسْتَلَّهُ مِنْ تَحْتِ رَأْسِهِ فَاسْتَيْقَظَ فَصَاحَ بِهِ فَأُخِذَ ‏.‏ وَرَوَاهُ الزُّهْرِيُّ عَنْ صَفْوَانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ فَنَامَ فِي الْمَسْجِدِ وَتَوَسَّدَ رِدَاءَهُ فَجَاءَهُ سَارِقٌ فَأَخَذَ رِدَاءَهُ فَأُخِذَ السَّارِقُ فَجِيءَ بِهِ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ সাফওয়ান ইবনু উমাইয়্যাহ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি তিরিশ দিরহাম মূল্যর আমার একটি চাদরে মাসজিদে ঘুমিয়েছিলাম। অতঃপর এক ব্যাক্তি এসে আমার কাছ থেকে সেটা টেনে নিয়ে যায়। তাকে হাতেনাতে ধরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট নিয়ে আসা হলে তিনি তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাঁর নিকট হাজির হয়ে বললাম, মাত্র ত্রিশটি দিরহামের কারনে আপনি তার হাত কাটাবেন? আমি তার নিকট এটা বাকীতে বিক্রি করছি। তিনি বললেন, তুমি তাকে আমার নিকট নিয়ে আসার পূর্বে তা করলে না কেনো? ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, যায়িদাহ সিমাকের সূত্রে জুআইদ ইবনু হুযাইর হতে এই হাদীস বর্ণনা করে বলেন, সাফওয়ান ঘুমিয়েছিলেন। তাউস ও মুজাহিদ এ হাদীস বর্ণনা করে বলেন, তিনি ঘুমন্ত ছিলেন। চোর এসে তার মাথার নীচ হতে চাদরটি চুরি করে নিয়ে যায়। আবূ সালামাহ ইবনু ‘আবদুর রা্হমান’ এ হাদীস বর্ণনা করে বলেন, চোরটি তার মাথার নীচ হতে চাদরটি টান দিয়ে নিয়ে যায়। তিনি জাগ্রত হয়ে চিৎকার দেন এবং তাকে ধরে ফেলা হয়। যুহরী (রহঃ) সাফওয়ান ইবনু ‘আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করে বলেন, তার চাদরটাকে তিনি বালিশ বানিয়ে মাথার নিচে রেখে মাসজিদে ঘুমান। এ সময় চোর এসে তার চাদরটা হস্তগত করে। তিনি তাকে ধরে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট নিয়ে আসেন। সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৩৯৪ সুতরাং দন্ডবিধি বিচারকের কাছে পৌঁছে গেলে শাস্তি না দেয়ার জন্য আমরা বিচারকের কাছে সুপারিশ করব না। তবে এর আগে করা যাবে। কারো পাপ হয়ে গেলে এটা গোপন রেখে আল্লাহর কাছে তাওবা করা উচিত কেউ চুরি করে ফেললে অথবা মদ পান করলে অথবা যিনা করে ফেললে গোপনে আল্লাহর কাছে তওবা করে ফেলবে। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই আপনার পাপ ক্ষমা করে দিবেন, قُلۡ یٰعِبَادِیَ الَّذِیۡنَ اَسۡرَفُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یَغۡفِرُ الذُّنُوۡبَ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّهٗ هُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সূরা যুমার, ৩৯/৫৩। পাপ কাজ করে ফেললে তা কারো কাছে বলবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন, ‎ ‏ "‏ كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلاَّ الْمُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ الْمَجَانَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلاً، ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ، فَيَقُولَ يَا فُلاَنُ عَمِلْتُ الْبَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا، وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهُ ‏"‏‏.‏ আমার সকল উম্মাতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী ব্যতীত। আর নিশ্চয় এ বড়ই অন্যায় যে, কোন লোক রাতের বেলা অপরাধ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু সে সকাল হলে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটাল যে, আল্লাহ তার কর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার উপর আল্লাহর দেয়া আবরণ খুলে ফেলল। বুখারী, হাদিস নং ৬০৬৯ আমাদের অনেকেরই বদ অভ্যাস, পাপ কাজ করে মানুষের কাছে তা বলে বেড়ানো। পাপ হয়ে গেলে নিরবে নিভৃতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কারো উপর দন্ডবিধি কার্যকর করা হলে পরকালে তাকে আর এই পাপের কারণে পাকড়াও করা হবে না কারো উপর দন্ডবিধি কার্যকর করা হলে তার এই পাপ কাফফারা হয়ে যাবে। অর্থাৎ পরকালে এই পাপের কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হবে না। উবাদাহ ইবনুস সামিত রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, بَايَعَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَلَى أَنْ لَا نُشْرِكَ بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَا نَسْرِقَ، وَلَا نَزْنِيَ، وَلَا نَقْتُلَ أَوْلَادَنَا، وَلَا نَأْتِيَ بِبُهْتَانٍ نَفْتَرِيهِ بَيْنَ أَيْدِينَا وَأَرْجُلِنَا، وَلَا نَعْصِيَ فِي مَعْرُوفٍ. فَمَنْ وَفَّى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ فِي الدُّنْيَا فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللَّهُ فَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ: إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ. আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বাইআত নিয়েছিলাম যে, আমরা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরীক করব না, চুরি করব না, ব্যভিচার করব না, আমাদের সন্তানদের হত্যা করব না, নিজের হাতে ও পায়ে মিথ্যা অপবাদ রচনা করব না, এবং সৎ-কাজে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অবাধ্য হব না। এরপর নবী ﷺ বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে তার অঙ্গীকার পূরণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর নিকট রয়েছে; আর যে এর কোনো কিছু করে এবং দুনিয়ায় শাস্তি পায়, তা তার জন্য কাফফারা; আর যে গোপনে থেকে যায়, তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভর করছে — তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দেবেন। মুসলিম, হা/১৭০৯। তবে হ্যাঁ, সে যদি এই পাপ ছাড়া অন্য পাপ করে তাহলে ওই পাপের কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। যেমন কেউ বিবাহিত অবস্থায় যিনা করেছে। তারপর তাকে রজম করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে যিনার শাস্তি পরকালে হবে না। সে যদি যিনা করার আগে কারো মাল আত্মসাৎ করে থাকে তাহলে যিনার শাস্তি দেয়ার কারণে তার এই পাপ মোচন হবে না। পরকালে তার এই পাপের হিসাব নেওয়া হবে। কিন্তু যিনার পাপের হিসাব নেয়া হবে না। কারণ দুনিয়াতে এর শাস্তি হয়েছে। নবী সাল্লাহু আলাই সালাম বলেন, يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ “শহীদের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়, তবে ঋণ ছাড়া।” মুসলিম, হা/১৮৮৬। এখানে লক্ষ্য করুন, শহীদ হওয়ার কারণে তার সকল পাপ মোচন করা হয়েছে। কিন্তু ঋণের পাপ হয়নি। অনুরূপ তার বিধান।

    সাইদুর রহমান 
    Next Post Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url