সূচিপত্র

    প্রণোদনার টাকা আর ক্যাশ-আউটের টোল: আমরা কি আসলে ডিজিটাল হয়েছি?


    রুন, মালয়েশিয়া থেকে এক ছেলে তার মাকে কুড়ি হাজার টাকা পাঠাল। বৈধ পথে টাকাটা আসায় সরকার খুশি হয়ে আরও ৫০০ টাকা বোনাস বা প্রণোদনা দিল। মা তো বেশ খুশি! তিনি গেলেন বাজারের বিকাশের দোকানে টাকাটা তুলতে। দোকানদার টাকা গুনে দেওয়ার সময় ক্যাশ-আউট চার্জ বাবদ কেটে রাখল প্রায় ৩৮০ টাকা। (হাজারে সাড়ে আঠারো টাকা হিসাবে)।

    ​খেয়াল করে দেখুন ব্যাপারটা! রাষ্ট্র যে ৫০০ টাকা উপহার দিল, তার প্রায় পুরোটাই কোম্পানি চার্জ হিসেবে কেটে নিয়ে গেল। মায়ের হাতে ঘুরেফিরে সেই আগের টাকাই রইল। মা হয়তো টেরই পেলেন না। আমরাও কেউ পাই না। এই চার্জ দেওয়াটা আমাদের কাছে এখন বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই প্রণোদনা দিতে রাষ্ট্রের বছরে খরচ হয় প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা—যা আমাদেরই করের টাকা। পাইপের এক মুখে রাষ্ট্র ভর্তুকি দিচ্ছে, আর অন্য মুখে বসে কোম্পানিগুলো টোল আদায় করছে।

    ​এই ৩৮০ টাকার গল্পটা আসলে একটু তলিয়ে দেখার মতো।

    ​বিকাশ কি ব্যাংক?

    আমরা অনেকেই ভাবি বিকাশ বা নগদ বোধহয় ব্যাংক। ব্র্যাক ব্যাংকের নাম জড়িত থাকায় শুনতে নিরাপদও লাগে। কিন্তু সত্যিটা হলো, বিকাশ কোনো ব্যাংক নয়, এটা স্রেফ একটা ডিজিটাল মানিব্যাগ (MFS)। ব্যাংকে টাকা রাখলে আপনি আমানতকারী, ব্যাংক আপনার টাকার দায়িত্ব নেয়, সুদ দেয়। কিন্তু বিকাশে আপনি শুধুই একজন গ্রাহক। আপনার টাকাটা ওদের খাতায় 'ই-মানি' বা ডিজিটাল জমা হিসেবে থাকে।

    ​তাহলে এরা এত লাভ করে কীভাবে? মূল জাদুটা তিন জায়গায়। এক, আমাদের কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে ট্রাস্ট ফান্ড হিসেবে জমা থাকে, সেই বিশাল অংকের সুদের টাকাটা কোম্পানি পায়, আমরা না। দুই, টাকা পাঠানো বা বিল দেওয়ার সময় ছোট ছোট ফি। আর তিন, সবচেয়ে বড় অস্ত্র—ক্যাশ-আউট চার্জ।

    ​পাশের দেশ ভারতের চিত্রটা কেমন?

    ভারতে কিন্তু ক্যাশ-আউট চার্জ শূন্য! তারা ইউপিআই (UPI) নামের একটা ব্যবস্থা বানিয়েছে। এই রাস্তার মালিক কোনো কোম্পানি না, ব্যাংকগুলো মিলে গড়া একটা অলাভজনক সংস্থা। গুগল পে বা ফোন পে হলো শুধু ওই রাস্তার গাড়ি। টাকা সোজা এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে যায়। চা-ওয়ালা থেকে রিকশাওয়ালা—সবার কাছে কিউআর কোড আছে। তাই ক্যাশ তোলার দরকারই পড়ে না। আর তুললেও মানুষ এটিএম থেকে বা ব্যাংক থেকে তোলে, মানিব্যাগ থেকে চড়া চার্জ দিয়ে নয়।

    ​আমাদের সমস্যা হলো, আমাদের ডিজিটাল পেমেন্ট এখনো সেভাবে দাঁড়ায়নি। অনলাইনে কেনাকাটা করলেও ৮০ ভাগ মানুষ ক্যাশ-অন-ডেলিভারি করেন। তাই ওয়ালেটে টাকা এলে তা তোলা ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না। আর এই নিরুপায় হওয়ার সুযোগটাই নেয় কোম্পানিগুলো।

    ​দেয়ালের ভেতরের রাজনীতি

    বছরের পর বছর বিকাশ থেকে নগদে টাকা পাঠানো যেত না। যেন একেকটা আলাদা দ্বীপ! টাকা সরাতে হলে ক্যাশ-আউট করে আবার ক্যাশ-ইন করতে হতো (মানে ডাবল চার্জ)। সরকার একবার এই দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিল 'বিনিময়' নামের একটা প্ল্যাটফর্ম দিয়ে। জনগণের ৬৫ কোটি টাকা খরচ করে বানানো সেই সিস্টেম কেন ফ্লপ করল, তার উত্তর সম্প্রতি মিলেছে। জানা গেল, এটি বানানো হয়েছিল শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে এবং পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন এক মন্ত্রীর ছেলের শেল কোম্পানিকে! ভারতের ইউপিআই চালায় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, আর আমাদেরটা চলেছিল মন্ত্রীর ছেলের পকেটে।

    ​খাজনা-পুঁজিবাদের শিকার আমরা

    অর্থনীতিতে একটা কথা আছে—'খাজনা-পুঁজিবাদ'। এদের কোনো উৎপাদন নেই, কারখানা নেই, শুধু একটা গেট বসিয়ে টোল আদায় করে এরা। কোটি কোটি গরিব মানুষের জমানো টাকা তোলার দরজাটা হলো সেই টোলঘর।

    ​গত বছর বিকাশের মুনাফা হয়েছে রেকর্ড ৩১৬ কোটি টাকা! আর মালিকানার তালিকায় আছে আমেরিকার মানি ইন মোশন, আলিবাবা, জাপানের সফটব্যাংকের মতো জায়ান্টরা। লেনদেন আমাদের, টাকা আমাদের, অথচ খাজনা চলে যাচ্ছে টোকিও বা ওয়াশিংটনে।

    ​উল্টো পিঠের সত্য

    আমি বলছি না যে বিকাশ বা নগদ কোনো কাজেই আসেনি। একসময় টাকা পাঠাতে দিনের পর দিন লাগত, হুন্ডির ঝুঁকি ছিল। মোবাইল ব্যাংকিং এসে সেটাকে এক মিনিটের কাজ করে দিয়েছে। গ্রামের কোটি কোটি মানুষের প্রথম আর্থিক অ্যাকাউন্ট এই মোবাইল ব্যাংকিং। এটা অবশ্যই একটা বড় বিপ্লব।

    ​কিন্তু আক্ষেপটা অন্য জায়গায়। আক্ষেপটা হলো, আমাদের কোনো বিকল্প নেই। একটা ফ্রি সরকারি বা ব্যাংক-ভিত্তিক রাস্তা থাকলে মানুষ বেছে নিতে পারত। তাড়া থাকলে টাকা দিয়ে বিকাশে যেত, না থাকলে ফ্রি রাস্তায়। সেই বিকল্পটা নেই বলেই চার্জ দেওয়া ছাড়া আমাদের উপায়ও নেই। আর এই চার্জ ধনীদের গায়ে না লাগলেও, একজন সাধারণ শ্রমিকের কাছে হাজারে সাড়ে আঠারো টাকা মানে এক বেলার বাজারের সমতুল্য।

    ​মালয়েশিয়া থেকে আসা ওই টাকার যাত্রাটার কথা একবার ভাবুন তো। টাকাটা ডিজিটাল হয়ে দেশে এলো, ব্যাংক পার হলো ডিজিটাল হয়ে, ওয়ালেটে ঢুকল ডিজিটাল হয়ে। এত প্রযুক্তি, এত আয়োজনের পর শেষ ধাপে এসে মায়ের আঁচলে যখন বাঁধা পড়ল, তখন তা আবার সেই কাগজের নোট! ডিজিটাল থেকে নগদে ফেরার এই ছোট্ট পথটুকু পার হতে যে টোলটা দিতে হলো, সেই হিসাবটা ওই মা কোনোদিনও বুঝবেন না। কেউ বোঝায়ওনি!

    Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url