সূচিপত্র

    ইসলাম কেন অমুসলিমদের বন্ধু বানাতে নিষেধ করেছে

     


    ইসলাম কখনো অমুসলিমদের সাধারণ বন্ধু বানাতে নিষেধ করেনি। বরং অভিভাবক বা অন্তরঙ্গ বন্ধু বানাতে নিষেধ করেছে।(2)

    সাধারণ বন্ধু আর অভিভাবক বা অন্তরঙ্গ বন্ধু এক জিনিস নয়। দুটি শব্দের মাঝে বিস্তর ফারাক রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

     يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

    “অহে ঈমানদারগণ! ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অভিভাবক নির্ধারণ করো না। তারা একে অপরের অভিভাবক। তোমাদের মাঝে যে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে তাদের দলভুক্ত। নিশ্চয় আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে সুপথ বাতলে দেন না।”(3)

    ‘অলি’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর অর্থ সাধারণ বন্ধুও হয় আবার অভিভাবক বা অন্তরঙ্গ বন্ধুও হয়। অভিভাবক মানে হলো কর্তা । যেমন পরিবারের কর্তা হলো অভিভাবক অর্থাৎ স্বামী বা পিতা। তিনি যেভাবে গাইডলাইন দিবেন, সেভাবে চলতে হবে। অমুসলিমারা গার্ডিয়ান হতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের নিষেধ করেছেন অমুসলিমদের অবিভাবক (গার্ডিয়ান) বানাতে ।

    পার্থিব জীবনে চলাচলের ক্ষেত্রে বন্ধু বানাতে নিষেধ করেননি। কারণ হক-বাতিলের সংঘাত আবহমানকাল থেকে চলছে এবং কেয়ামত অবধি চলবে। অমুসলিমরা সদা মুসলিমদের ক্ষতি করতে চায়। এটা আমাদের মুখের বুলি নয়, বরং আল্লাহ তায়ালা বলছেন,

    وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

    “তোমাদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দেয়া অবধি তারা (ইহুদি খ্রিস্টান) তোমাদের সাথে যথাসাধ্য সদা সংগ্রাম করতে থাকবে। তোমাদের মাঝে যে দ্বীন থেকে পিছু হটবে, আর এমতাবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে, তার যাপিত জীবনের আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে। এরাই তো জাহান্নামের অধিবাসী। সেথায় চিরকাল অবস্থান করবে।” (4)

    وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ 

    “ইহুদি খ্রিস্টানদের ধর্ম অনুসরণ করার আগ পর্যন্ত তারা তোমাদের উপর তুষ্ট হবে না।” (5)

    আপনি হতবাক হবেন অমুসলিমদের আচরণে! মুসলিমরা দুঃখ-কষ্ট বিপদাপদে থাকলে অমুসলিমরা আনন্দ বোধ করে। মুসলিমদের উন্নতি অগ্রগতি সমৃদ্ধি সুখ-শান্তি তারা সহ্য করতে পারে না। আল্লাহ তাদের সম্পর্কে কী বলছেন জানেন?  

    “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ব্যতিত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানাবে না। তারা তোমাদের অনিষ্ট করতে বিন্দু পরিমাণ ত্রুটি করবে না। যা তোমাদেরকে বিপন্ন করে, তা-ই তারা কামনা করে। তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ পায় এবং তাদের অন্তরে যা গোপন রাখে তা আরও গুরুতর। তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করেছি, যদি তোমরা অনুধাবন করো। দেখো তোমরাই তাদেরকে ভালোবাসো, কিন্তু তারা তোমাদের কে ভালোবাসে না। অথচ তোমরা সব কিতাবে ঈমান রাখো। আর তারা যখন তোমাদের সংস্পর্শে আসে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি, কিন্তু তারা যখন একান্তে মিলিত হয়, তখন তোমাদের প্রতি আক্রোশে তারা নিজেদের আংগুলের অগ্রভাগ দাঁত দিয়ে কাটতে থাকে। বলো, তোমাদের আক্রোশেই তোমরা মারা যাও। নিশ্চয় অন্তরে যা রয়েছে সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত। তোমাদের মঙ্গল হলে তা তাদেরকে কষ্ট দেয়, আর তোমাদের অমঙ্গল হলে তারা তাতে আনন্দিত হয়। তোমরা যদি ধৈর্যশীল হও এবং মুত্তাকী হও, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছু ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে রেখেছেন।” (6)

    তারা চটকদার, মুখরোচক, মধুমাখা বুলি আউড়িয়ে মুসলিমদের তুষ্ট রাখতে চায়,

    يُرْضُونَكُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ وَتَأْبَى قُلُوبُهُمْ وَأَكْثَرُهُمْ فَاسِقُونَ 

    “তারা মুখ দিয়ে তোমাদের পরিতৃপ্ত রাখতে চায়, কিন্তু তাদের অন্তর তা মেনে নেয় না। তাদের অধিকাংশই পাপিষ্ঠ।”(7)

    কখনোই তারা মুসলিমদের বন্ধু মনে করে না। সদা ক্ষতিসাধনে তৎপর। এখন এই সকল লোকদের যদি অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করা হয় তাহলে তারা ভালো পরামর্শ দিবে নাকি মন্দ তা সহজেই অনুমেয়। তারা মুসলিমদের ওপর বিষোদগার করে বলে, যে মুসলিমরা অমুসলিমদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে না কেন? আমাদের প্রশ্ন হলো অমুসলিমরা কেন মুসলিমদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে না? তারা তো কখনো এটা করে না। আল্লাহ তাআলা শুধু অমুসলিমদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেননি, বরং নিকটাত্মীয়দের কেউ যদি কুফরীকে ঈমানের উপর প্রাধান্য দেয়, তাদেরও অভিভাবক বানাতে নিষেধ করেছেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ 

    “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পিতৃবর্গ ও ভাতৃবৃন্দ যদি ঈমানের পরিবর্তে কুফুরী কে পছন্দ করে, তবে তাদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করো না।”(8) 

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পার্থিব বিষয়ে অমুসলিমদের সাথে চলাফেরা, লেনদেন, সামাজিক আচার আচরণ, উঠাবসা করেছেন; এমনকি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিও করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রয়াণের সময়ও তার লৌহবর্ম এক ইহুদীর কাছে ছিল।

     عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ تُوُفِّيَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَدِرْعُهُ مَرْهُوْنَةٌ عِنْدَ يَهُوْدِيٍّ بِثَلَاثِيْنَ صَاعًا مِنْ شَعِيْرٍ 

    আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর সময় তাঁর বর্মটি ত্রিশ সাথ যব-এর বিনিময়ে এক ইহুদির নিকট বন্ধক ছিল।(9)

     ইসলাম পার্থিব জীবনে অমুসলিমদের সাথে চলাচলের ক্ষেত্রে অনুমতি দিয়েছে। তাদের বাড়ীতে যাওয়া ,একসাথে উঠাবসা করা, কথাবার্তা বলা দাওয়াত খাওয়া বৈধ আছে। তবে হালাল খাদ্য হতে হবে। হারাম হলে বর্জন করতে হবে। তাদের সাথে চলাচলের ক্ষেত্রে তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা যাবে না ।তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাওয়া যাবে না, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের খাদ্য খাওয়া যাবে না। নবী বলেন,

      ‏ "‏ مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‏"‏ ‏.

     “যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের দলভুক্ত।” (10)

     এক ইহুদি কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেবা যত্ন করতো। কোনো একসময় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে যান। 

      كَانَ غُلاَمٌ يَهُودِيٌّ يَخْدُمُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَمَرِضَ، فَأَتَاهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَعُودُهُ، فَقَعَدَ عِنْدَ رَأْسِهِ فَقَالَ لَهُ ‏"‏ أَسْلِمْ ‏"‏‏.‏ فَنَظَرَ إِلَى أَبِيهِ وَهْوَ عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُ أَطِعْ أَبَا الْقَاسِمِ صلى الله عليه وسلم‏.‏ فَأَسْلَمَ، فَخَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَهْوَ يَقُولُ ‏"‏ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ مِنَ النَّارِ ‏"‏‏.‏

    এক ইহুদি কিশোর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমাত করতো, সে একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখার জন্য আসলেন। তিনি তার শিয়রে বসে তাকে বললেন,“তুমি ইসলাম গ্রহণ করো”। সে তখন তার পিতার দিকে তাকাল, সে তার নিকটেই ছিল, পিতা তাকে বললো, আবুল কাসেম (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুনিয়াত) এর কথা মেনে নাও। তখন সে ইসলাম গ্রহণ করলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখান হতে বের হয়ে যাওয়ার সময় বলেন, “যাবতীয় প্রশংসা সে আল্লাহর, যিনি তাকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দিলেন।”(11)

    যে সকল অমুসলিম দ্বীন পালনে মুসলিমদের বাধা প্রদান করবে না বা যুদ্ধ করে না, সহাবস্থানে মুসলিমদের সাথে থাকতে চায় তাদের সাথে উত্তম আচরণ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা উদ্বুদ্ধ করেছেন,

    لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

     “দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি তাদের প্রতি মহানুভবতা দেখাতে ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেননি ।নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহ শুধু তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদেরকে বের করাতে সাহায্য করেছে । আর তাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে তারাই তো জালেম।” (12)

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের ভোজন পর্যন্ত গ্রহণ করেছেন । অথচ তিনি জানতেন যে ইহুদীরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ গ্রহণ করতো।

    এক ইহুদি নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বিষ মিশ্রিত ছাগলের গোশত নিয়ে আসলো। তিনি সেখান হতে (কিয়দংশ) খেলেন। অতঃপর তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিয়ে আসা হলো। তিনি তার কাছে (সে কেন এমন করলো) এ বিষয়ে জানতে চাইলে সে বললো, আমি আপনাকে হত্যা করার ইচ্ছা করছিলাম। তিনি বললেন, “আল্লাহ এ বিষয়ে তোমাকে ক্ষমতা দিবেন না অথবা তিনি বললেন, আমার উপরে ক্ষমতা দিবেন এমন নয়।” বর্ণনাকারী বলেন, তারা (সাহাবীগণ) বললেন, আমরা কি তাকে ‘হত্যাথ করবো না’? তিনি বললেন, “না।” (13)

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো অমুসলিমদের জাতিগত নিধন করার লক্ষে যুদ্ধ করেননি এবং তাদের উৎপীড়ন করার জন্য সাহাবীদের প্ররোচিতও করেননি।

    সদা তাদের ধর্মীয় স্বাধীনত দিয়েছেন। অতএব অমুসলিমদের সাথে চলাফেরা করতে কোন সমস্যা নেই, তবে সমস্যা হলো তাদের অভিভাবক বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করাতে।

    চলবে......

    রেফারেন্স: 

    2. (তাফসিরে যাকারিয়া, আলে ইমরান, ৩/১১৮)

    3. (সূরা মায়েদা, ৫/৫১)

    4. (সূরা বাকারা, ২/২১৭)

    5. (সূরা বাকারা, ২/১২০)

    6. (আলে ইমরান, ৩/১১৮-২০)

    7. (তাওবা, ৯/৮)

    8. (তাওয়,৯/২৩)

    9 .(বুখারী, হা/ ২৯১৬)

    10. (আবু দাউদ, হা/ ৪০৩১)

    11 . ( বুখারী, হা/ ১৩৫৬)

    12. (মুমতাহিনা ৮-৯)

    13. ( মুসলিম, হা/ ৫৫৯৮)




    Next Post Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url