সূচিপত্র

    প্রেম অগ্নিদহন যন্ত্রণা

     


    প্রিয় হে, জীবন সায়াহ্নে তোমাকে দু'চারটি কথা বলবো, যা আমি বহুদিন যাবত বুকে লালন করে এসেছি। প্রতিটি কথাই বলবো বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে । তুমি ক্ষণিকের জন্যে কানটা সটান করো। লেখাপড়ার কালে কখনো ভুল করেও প্রেম রাজ্যের অলিগলিতে হামাগুড়ি দিবে না। এর বিষ ক্রিয়া তুমি সহ্য করতে পারবে না। সহ্য করার মতো তোমার যে শক্তি সামর্থ্য নেই। আবারো বলছি, আমার কথাগুলো নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করো। তুমি তোমার আশপাশে অনেকেই দেখবে প্রেম সাগরে অবগাহন করছে। এই সাগরের চোখ ধাঁধানো শীতল জল থেকে ক্ষণিকের জন্য তনুমন শিহরিত করছে। মাঝে মধ্যে উৎফুল্লতার গল্পের ঝুড়ি তোমার কাছে এসে শেয়ার করছে । অবচেতন মনে তোমারও মন চাইবে প্রেমের শীতলতা থেকে একটু গা টা শিহরিত করে নেই, চেখে নেই প্রেমের যৎসামান্য মিষ্টতা। আমিও প্রেমের অপলাপ আডডায় মজে থাকি। না, কখনো করা যাবে না। এটা হীম শীতল জল নহে। নরকের অনল। পা দিলেই পরক্ষণেই ভস্মীভূত হয়ে যাবে তোমার গোটা দেহ। কত নিষ্পাপ দেহকে দেখেছি উদ্দিপনার সাথে সদা সর্বদা প্রাণবন্ত হয়ে লেখাপড়ার মজায় মগ্ন থাকতো। দু'দন্ড সময় মিলতো না কারো সাথে একটু আলাপচারিতায় নিমগ্ন হওয়ার। পড়ালেখা আর পড়ালেখা। কিন্তু কোনো একদিন শয়তানের ফাঁদে পড়ে ভুলে চলে যায় প্রেম রাজ্যের চোরাবালিতে।  শত চেষ্টা করেও এই চোরাবালির মুখ থেকে আর ফিরে আসতে পারেনি  । পরিশেষে ভূগর্ভস্থে বিলীন হয়ে গেছে। কেউ জানে না তার অস্তিত্বের খবর। কিছুকাল পূর্বেও তার লেখাপড়ার গতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। সময়ের পরিক্রমায় এখন সে মানুষের উপমাতে পরিণত হয়েছে। কত বালককে  দেখেছি সেলফের সাথে মাথা ঠুকরিয়ে গুঙ্গিয়ে কাঁদতে। ছায়া ঘেরা বিকেলে যখন আমরা খুনসুটি আর খোশগল্পে মজে থাকতাম, তখন সে চেহারা কালো করে নিরবে নিভৃতে একা একা বসে থাকতো। তার দেহাবয়ব দেখলেই মনে হতো তার ভেতরে লেলিহান অগ্নি শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে। কিন্তু চোখ লজ্জায় সে কাউকে কিছু বলতে পারতো না। চিন্তা, বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তাকে তিলে তিলে আমার চোখের সামনে শেষ করে দিয়েছে। অতএব, আমার ছেলে, ভুলেও এ জগতে পা বাড়াবে না। প্রেম অগ্নি দহনের যন্ত্রণা যে কত পীড়াদায়ক তা তোমাকে বোঝাতে পারবো না। এটা শুধু তারাই বুঝবে যারা এই অনলে পা দিয়েছে। তোমাকে সতর্ক করার মানসে আজ এই লেখাটা। ভীষণ মনোযোগ দিয়ে পড়বে। শুধু তোমাকে নিবৃত রাখার জন্য আমি কষ্ট করেছি। প্রেম অগ্নির কিছু কুফল তোমার সাথে শেয়ার করছি।


    (১) আল্লাহর কাছ থেকে শাস্তি: 


    আল্লাহ বলেন, 


    ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ 


     "জলে ও স্থলে যে বিপর্যয় আপতিত হয়ে থাকে তা মানুষের হস্তের উপার্জন।  যেন তারা সঠিক পথে ফিরে আসে এ জন্য তিনি তাদেরকে তাদের অপকর্মের কিছু শাস্তি আস্বাদন করান।"(সূরা রূম৪১)


    وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ 

     " আমরা তাদের বড় শাস্তি দেয়ার পূর্বে ছোট শাস্তি দিয়ে থাকি যাতে তারা ফিরে আসে।"(সূরা সাজদাহ ২১)


    আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি দুভাবে হয়ে থাকে। শারীরিক ও মানসিক।  রাত জেগে প্রেয়সীর সাথে অহেতুক প্রণয়ের আলাপে মজে থাকলে ফুটফুটে সজীব সতেজ চেহারাও ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাবে। চোখের পাপড়ির নিচে কালো রেখা পড়বে, মুখে ব্রন দেখা মিলবে, চেহারা মলিন হয়ে যাবে,শরীরের ওজন কমে যাবে, চেহারা ভয়ঙ্কর হয়ে যাবে, ভেঙ্গে যাবে ও যৌন সমস্যা দেখা দিবে।  কারণ আল্লাহ তাআলা ঘুমের জন্য রাত নির্ধারণ করেছেন । সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি, পরিশ্রমের দরুন দুর্বলতার বড়োসড়ো আস্তরণ ঘুমানোর মাধ্যমে ডিলেট হয়ে যায়, আবার পূণরায় ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া সজীবতা, উদ্যমতা। প্রভাতে ফুড়ফুড়ে চাঙ্গা মন নিয়ে আমরা আবার কর্ম ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বিনিদ্র রাত্রি যাপন করে গোটা দিন ঘুমালেও রাতের ছুটে যাওয়া প্রাণবন্ত ঘুম পোষাবে না। আরে ভাই, রাতকে তো আল্লাহ নির্ধারণই করেছেন ঘুমের জন্য। রাতের ঘুম মহান রবের পক্ষ থেকে পরম অনুগ্ৰহ, যা বেখেয়ালিপনা ও অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। তুমি আমাকে বলো তো সারারাত ওই তরুণীর সাথে কিসের আলাপ করেছো? গোটা রাতের অর্ধেকের বেশি সময় তো শুধু তার সাথে রাগ অভিমানের ঝুলি উপস্থাপনের মাধ্যমেই কেটেছে। কখনো হেসেছো, কখনো কেঁদেছো কখনো অভিমান করেছো আবার কখনো বা রোমান্টিকতার দরিয়ায় ডুব দিয়ে খানিকটা শীতলতা অনুভব করেছো। একটু সময় করে মুক্তমনে চিন্তা ভাবনার খাতায় আঁকিবুঁকি দাও তো। কী আবল তাবল না বললাম রাতভর! কিছু তো শুরু শেষ খোঁজে পাচ্ছি না! কী লাভ হয়েছে? বলতে পারো সাময়িকের জন্য একটু ভালোবাসার মজা চেখেছি। আমি বলবো, এটা হলো শয়তানের ভীষণ বড় ধোঁকা। তুমি তো বুঝতে পারলে না। তুমি তো মরীচিকার পেছনে ঘুরছো। দিন শেষে দেখবে রিক্তহস্তে ফিরবে। শুধু অযথা তোমার জীবন ও গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হবে। মানসিক শাস্তি কী পাবে জানো? তুমি খেতে পারবে না, বমি আসবে। মনে হবে ভেতর থেকে সব বের হয়ে আসছে। চিন্তা বিষণ্ণতার কারণে তুমি কিছুই করতে পারবে না। সব কিছু বিরক্তকর লাগবে। কাছের মানুষগুলোর কথা বিদঘুটে ও তিতা লাগবে। মন মেজাজ স্বাভাবিক থাকবে না । কিছুটা উগ্র বনে যাবে। পড়ালেখা, কাজকারবার কোনো কিছুতেই মন থাকবে না। এক কথায় বলতে গেলে তুমি অস্বাভাবিক হয়ে যাবে। ক্ষণে ক্ষণে তোমাকে তার স্মৃতিগুলো প্রকান্ড বিষাক্ত সাপ হয়ে কামড়াতে থাকবে। আর তুমি ভেতরে ভেতরে হাউমাউ করে চিৎকার করতে থাকবে; কিন্তু দেউ দেখবে না, কেউ শুনবে এই করুণ আর্তনাদের সুর। তুমি একা একা কষ্ট পেতে পেতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবে। মাঝেমধ্যে যদি মনটা একটু প্রাণবন্ত করার মানসে কোথাও বেড়াতে যাও । আর সেখানে হুট করে কোনো কথা তোমার কর্ণকুহরে ভেসে আসে, যা তুমি ইতোপূর্বে তোমার প্রেমিকার সাথে সঙ্গগোপনে বলেছো তাহলে সাথে সাথে এই কথামালা রশি হয়ে তোমার টুঁটি চেপে ধরবে। মুহূর্তের মধ্যে তোমার আনন্দ উল্লাস বিলীন হয়ে যাবে, তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাবে। গোটা পৃথিবীটা বিশাল প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমার কাছে সংকোচিত হয়ে যাবে। এই বসুন্ধরায় তোমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। মানসিক বিষণ্নতা এমন, যা বলা নেই কওয়া নেই হুট করে চলে আসে। তুমি না চাইলেও আসবেই। কত বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও আত্মীয়স্বজন তোমাকে সান্ত্বনার বাণী শুনাবে; কিন্তু তোমার যন্ত্রণার আগুন তাদের সান্ত্বনার জলে নিভবে না। তাই আবারও বলছি, একটু চিন্তা ভাবনা করে দেখো।

    (২) তুমি অপমানিত হবে।

    তোমাকে একটা উদাহরণ দেই। ধরো, তুমি অনেক ভালো ছেলে। সত্যি সত্যি এই তরণীকে ভালোবাস। তাকে বিয়ে করার মানসেই প্রেম করেছো। আর মেয়ের বাবা কোনো পন্থায় জেনে গেছে যে, তুমি তার মেয়েকে ভালোবাস। এরপর তুমি তার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেছ। দেখবে তোমার প্রস্তাব নাকচ করে দিবে। কিছুতেই মেনে নিবে না। কারণ প্রেম ভালোবাসাকে মোটামুটি গার্ডিয়ানরা অপছন্দ করে। তোমার প্রেমের এই গল্প যদি কেউ জানতে পারে তাহলে তোমাকে নিন্দার চোখে দেখবে। তোমার কোনো কথা শুনবে না। আত্মীয়-স্বজন তোমার পেছনে তোমার সমালোচনা করবে। তুমি যদি শিক্ষক হও তাহলে ছাত্ররা তোমার কথা শুনবে না। কারণ ইতিহাস তোমাকে ছাড় দিবে না। তুমি যদি মহা জ্ঞানীও হয়েছে যাও, তথাপি লোকে বলবে, "হ, দেখেছি তাকে। কিছু দিন আগেও ওমুক মেয়ের সাথে প্রেম করে বেড়াতো। এখন মুসল্লি সেজেছে। বকধার্মিক। সে তো নিজেই ভালো না। নিজেই তো আমল করে না আবার অন্যদের উপদেশ দেয়।" কত কথা যে তুমি শুনতে পাবে তার ইয়াত্তা নেই। সাবধান হও।


    (৩) দারিদ্র্যতা আসবে। 

    রাতভর কথা বলতে তো টাকা খরচ হবে, তাই না? অহর্নিশি কথা বললে তোমার পকেটের টাকা শেষ হয়ে যাবে। আমি একজনকে দেখেছি। অনেক টাকা ছিল; কিন্তু তার রোগ ছিল শুধু প্রেম করা। রিক্সা,সি এন জি ও গাড়ির গেরেজ ছিল। সময়ের পালাবদলে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন সে অন্যের সি এন জি চালায়; অথচ কিছুকাল পূর্বে সে নিজেই কয়েকটি সি এন জির মালিক ছিল। এখন কথা হলো দারিদ্র্যতা আসবে কেন। তাহলে তোমাকে দুই একটা আয়াত শুনাই। আল্লাহ তাআলা বলেন,

    اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا  يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا

    وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا 

    ' তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি তো ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আসমান থেকে অজস্র বারি বর্ষণ করবেন, তোমাদের মাল ও সন্তান সন্ততি বৃদ্ধি করে দিবেন এবং উদ্যান দান করবেন ও নদী প্রবাহিত করে দিবেন।'(নূহ ১০-১২)


    এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি ক্ষমা প্রার্থনা করো তাহলে মাল সম্পদ বাড়িতে দিবো। এখন কথা হলো ক্ষমা প্রার্থনা করলে যদি মাল বাড়িয়ে দেন তাহলে এর বিপরীতে গুনাহ করলে অবশ্যই মাল কমে যাবে। এজন্যই কেউ প্রেম করলে শাস্তি স্বরূপ তার দারিদ্র্যতা দেখা মিলবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    إنَّ الرجلَ لَيُحرَمُ الرِّزقَ بالذَّنبِ يُصيبُه

    'পাপ করার কারণে ব্যক্তি রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়।' (ইবনে মাজাহ ৩২৬৪)


    (৪) আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হবে।

    প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে কত প্রাণ যে আত্মহত্যা করেছে ! অনেকে তো প্রেমিকা অন্যের ঘরে চলে যাবে এটা দেখে সহ্য করতে পারবে না বিধায় প্রেমিকাকেই চিরতরে এই বসুন্ধরা থেকে বিদায় করে দিয়েছে। এমনও ঘটনা ঘটেছে কয়েক বন্ধু মিলে প্রথমে ধর্ষণ করেছে। তারপর মেরে ফেলেছে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। প্রেমে ছ্যাকা খেলে জীবনটা একেবারে বিস্বাদময় হয়ে উঠে। জীবনের প্রতি অনিহা সৃষ্টি হয়। শয়তান তো আরো আছে ফুসলানোর জন্য। সে মনের ভেতর উস্কানি দেয়, "কার জন্য বেঁচে থাকবি। যাকে নিয়ে এত স্বপ্ন লালন করেছিলি, সে তো আজ অন্যের ঘরে রে। এই জীবন রেখে কী লাভ। শেষ করে দে এই জীবন।" বেস শয়তান চলে গেছে। এবার তুমি পা বাড়াও আত্মহত্যার দিকে। শয়তান তোমার চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়ে গেল। তোমাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে সে আজ বড্ড খুশি । আর তুমি তার সাথে হেরে এখন দ্বীর্ঘদিন জাহান্নামের লেলিহান অগ্নির শান্তি চাখো। আল্লাহ তাআলা কুরআনে সতর্ক করে বলেছেন, 


    وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا 


    "তোমরা নিজেদের হত্যা করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর অনুগ্ৰহশীল।" (


    وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ 


    "তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। অনুগ্ৰহ করো। নিশ্চয় আল্লাহ অনুগ্ৰহকারীদের ভালোবাসেন।"


    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মত যেন আত্মহত্যা না করে এজন্য সতর্ক করে বলেন, 


     ‏ "‏ مَنَ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَتَوَجَّأُ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ شَرِبَ سَمًّا فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ يَتَحَسَّاهُ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا وَمَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ فَهُوَ يَتَرَدَّى فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا ‏"‏ ‏.‏

     "যে ব্যক্তি কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে জাহান্নামের মধ্যে সে অস্ত্র দ্বারা সে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে, এভাবে তথায় সে চিরকাল অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামে আগুনের মধ্যে অবস্থান করে উক্ত বিষপান করতে থাকবে, এভাবে তথায় সে চিরকাল অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি নিজে পাহাড় থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে ব্যক্তি সর্বদা পাহাড় থেকে নীচে গড়িয়ে জাহান্নামের আগুনে পড়তে থাকবে, এভাবে সে ব্যক্তি তথায় চিরকাল অবস্থান করবে।" ( মুসলিম, ২০০)

     শেষ পর্যন্ত তুমি চির শত্রু শয়তানের কাছে পরাজিত হলে? তুমি কষ্ট যাতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার মানসে আত্মহত্যা করছো! কবরে তো হাজার গুণ বেশি কষ্ট পাবে। তাই শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কখনো আত্মহত্যা করো না।


    (৫) মা বাবার অবাধ্য হবে।

    প্রতিটি মা বাবা মনে প্রকান্ড একটা স্বপ্ন বুনন করে। আমার ছেলেকে ধুমধাম করে বিয়ে করাবো । আমার মেয়েকে লাল টুকটুকে করে বউ সাজিয়ে মহানন্দের সাথে ধুমধাম করে বিয়ে দিবো। উমমা, মেয়ে তো অপরিচিত এক ছেলে নিয়ে উধাও। বলা নেই কওয়া নেই হুট করে কোথায় যেন চলে গেল। দুদিন কোনো হদিস নেই। দুদিন পর জানা গেল বিয়ের খবর। বাবামার সারা জীবনের স্বপ্ন নিমিষেই উবে গেল। সন্তান কে নিয়ে কত গৌরব করতো মানুষের সাথে। এক অঘটনার তান্ডবে সবকিছু দুমড়েমুচড়ে নিঃশেষ হয়ে গেল। একটা ছেলে বা মেয়ের ফাঁদে পড়ে অবাধ্য হলে পরম আত্মীয় পিতা মাতার। অনেকে তো আবার প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে চির কুমার হয়ে থাকে। জীবনে আর বিয়ে করবে না। বাবা মা হাজার বললেও কথা গায়ে মাখে না। এই পাগল, তুমি চির কুমার থাকলে তোমার প্রেয়সীর বাবা মা কিন্তু তাকে ঠিকই বিয়ে দিয়ে দিবে বা দিয়ে ফেলেছে। কার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করছো? 'একটা কথা কান লাগিয়ে শুনো, "কারো জন্য নিজের জীবন নষ্ট করতে নেই।" তুমি যার জন্য মুখটা গুমড়া করে বসে আছো সে কিন্তু দিব্যি হেসে খেলে সময় পাড় করছে। সে যদি তোমাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারে তাহলে তুমি তাকে ছাড়া কেন ভালো থাকতে পারবে না। আমি জানি আমার কথাগুলো তোমার কাছে মহা ভারী ঠেকছে। মনে মনে বলছো, 'আরে মিয়া আপনি কী বুঝবেন বিরহ যাতনার কথা। উপদেশ দেয়া খুবই সহজ; কিন্তু পালন করা বহু কঠিন ।' এই ছেলে, তুমি তো বিসমিল্লাহতেই ভুল করলে। কেন গেলে ওই টিপাইমুখের ধারে। কোন শয়তানের কথা শুনে এ কাজ করলে? এখন যতই কষ্ট হোক এখান থেকে যে তোমাকে সোজা হয়ে বাড়ির পথে রওনা দিতে হবে। আমার উপর এতো গোস্বা করছো কেন? তুমি তোমার বাবা মার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু পরখ করো। তাদের নিয়ে একটু ভাবো। তাদের স্বপ্নটা নষ্ট করে দিয়ো না। আবারো ভাবো। বাবা মা কে কষ্ট দিলে কিন্তু এই পৃথিবীর তল্লাটেই তোমাকে শাস্তি পেতে হতে হবে। আল্লাহ কিছু অপরাধ করলে পৃথিবীতেই শাস্তি দিয়ে থাকেন। এর মাঝে অন্যতম হলো পিতা মাতার অবাধ্য হওয়া। মা বাবার কথা না শুনে প্রেম করে যাকে বিয়ে করলে সে তো তোমার সাথে মিলবে না। কয়দিন পর পর মন কষাকষি হবে। এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদের কালো আবরণ পড়বে। এজন্যই গবেষণায় দেখা গেছে প্রেমের বিয়েগুলোর অধিকাংশই পরবর্তীতে টিকেনি, বিচ্ছেদ ঘটেছে। কীভাবে সম্পর্ক অটুট থাকবে বলো তো। এই বিয়েতে তো তোমার মা বাবা অমত ছিল। তাই বলছি, বাবা মার অবাধ্য হয়ো না।


    (৬) অন্তর মরে যাবে ও নেক কাজ করতে পারবে না।

    আল্লাহ তাআলা বলেন,

    أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ 

    'জেনে রাখো,আল্লাহর স্মরণেই হ্নদয় প্রশান্তি লাভ করে।' (রাদ ২৮)

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

    ذاقَ طعمَ الإيمانِ من رضيَ باللهِ ربًّا وبالإسلامِ دينًا وبمحمَّدٍ نبيًّا.

    'ওই ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পাবে, যে আল্লাহ কে রব হিসেবে, ইসলাম কে দ্বীন হিসেবে ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবী  হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট হবে।'(মুসলিম ৩৪)


    প্রিয় হে, তুমি তো আল্লাহ যে ভালোবাসা পাওয়ার হকদার ছিলেন এটা দিয়ে দিয়েছো এক রমণীকে। তোমার অন্তর তো এ কারণে মরে গেছে। তুমি তো ঈমানের স্বাদ পাবে না। নেক কাজ করতে ভালো লাগবে না। সালাতে মন বসবে না। কেমন জানি সবকিছু বিরক্তিকর মনে হবে। তোমার হ্নদয়ে কারো উপদেশের শীতল বাণী প্রবেশ করবে না। তোমার হৃদয়ের মুখ তো পাপের আবরণে ঢেকে আছে ‌। তুমি দেখবে একপর্যায়ে তুমি গাফেল-উদাসীন হয়ে যাচ্ছো। তোমার মাঝের পরিবর্তন সকলের নজর কাড়বে। কিন্তু তুমি এই উদাসীনতা থেকে ফিরতে পারবে না। কীভাবে তুমি ফিরবে? অন্তর তো উদাসীনতা থেকে ফিরে আসে আল্লাহর স্মরণে । আর তুমি তো এতে নিমগ্নই হতে পারছো না। সালাতে দাঁড়ালে তার কথা মনে পড়ে। কীভাবে হেসে খেলে গোটা রাত অতিবাহিত করেছো তা মানসপটে ভেসে উঠে। সবাই দেখবে নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। শুধু তুমি একাই সবকিছুতে পিছিয়ে আছো। আমি তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি যদি মসজিদে না আসো তাহলে তোমার পরিবর্তে আরেকজন কিন্তু ঠিকই আসবে। তুমি কুরআন পড়ে যদি ভুলে যাও তাহলে অন্য কেউ কিন্তু ঠিকই কুরআন মুখস্থ করবে। তুমি আল্লাহর থেকে দূরে সরে গেলে আরেকজন কিন্তু আল্লাহ কে পাওয়ার জন্য অবিরত চেষ্টা করেই বেড়াবে। মাঝখান থেকে তুমি আল্লাহর থেকে দূরে সরে গেলে। তুমি জাহান্নামের আগুনের সন্নিকটে হলে। তুমি পাপ পঙ্কিলতার আস্তরণে পড়ে রইলে। আল্লাহর কিছুই হলো না। মনে রেখো, তুমি আল্লাহ কে ছেড়ে দিলে আল্লাহর কিছু আসে যায় না। কিন্তু আল্লাহ তোমাকে ছেড়ে দিলে তোমার সমস্যা আছে। তুমি ছাড়া আল্লাহর  অনেক বান্দা আছে; কিন্তু আল্লাহ ব্যতীত তোমার কোনো মালিক ও সাহায্যকারী নেই। তুমি আল্লাহ কে না ডাকলে তোমাকে ছাড়া আল্লাহ কে ডাকার মতো অজস্র তাঁর বান্দা রয়েছে। তোমার পরিণতি নিয়ে  সময় করে একটু ভাবো। আল্লাহ বলেন,


    وَإِنْ تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُمْ 

    'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়ে আসবেন, যে নাকি তোমাদের মতো হবে না।'(মুহাম্মদ ৩৮)


    إِنْ يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ 

    'তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদের শেষ করে দিয়ে অন্যদের নতুন করে নিয়ে আসবেন।'( ইবরাহীম ১৯)


    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ 

    'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মাঝে কেউ নিজ দ্বীন থেকে ফিরে চলে গেলে আল্লাহ অচিরেই এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন ও তারাও তাঁকে ভালোবাসবেন। তারা মুমিনদের প্রতি থাকবে কোমল ও কাফেরদের প্রতি থাকবে কঠোর।'( মায়েদা ৫৪)


    (৭) আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে ও দোআ কবুল হবে না। 

    গোপনে প্রেম করে বেড়ালে নিশ্চিত আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহর কাছে এর থেকে আশ্রয় চাই। কোনো দোআ করলে তিনি তা কবুল করবেন। চিন্তা বিষণ্ণতা থেকে দূরে থাকার জন্য দোআ করলে তা কবুল হবে না। কারণ মহান রব তো তোমার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন। তুমি খেয়াল করে দেখবে তোমার প্রার্থীত বিষয় তুমি দোআ করে পাচ্ছো না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে এই পাপ। আমি অনেককে বলতে শুনেছি, 'কত দোআ করছি কোনো দোআই তো কবুল হচ্ছে না'। দোআ কবুল হবে কীভাবে! রাস্তা তো বন্ধ হয়ে আছে। আগে পাপ থেকে বিরত থাকো তারপর দোআ করো। অবশ্যই তোমার দোআ কবুল হবে।  ইবনুল কাইয়ুম রহিমাহুল্লাহ প্রেমের আরো অনেক কুফল বর্ণনা করেছেন। তুমি আর গাফলতির মাঝে থাকবে না। ফিরে আসো আপন নীড়ে। সন্ধ্যা যে ঘনিয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি ফিরে আসো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে সুবোধ দান করুন আমীন।

    Next Post Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url