সূচিপত্র

    মেয়ে সন্তান হলে মনোক্ষুণ্ন হওয়া

     


    জাহেলী যুগে একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক উৎফুল্লতার সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করছে। আশানুরূপের চেয়ে বেশি লাভ হওয়ায় রীতিমতো তার মনটা বেশ পুলকিত। বহুদিন পর ব্যবসায়ে লাভের মুখ দেখেছে। বেঁচে যাওয়া পণ্য নিয়ে প্রফুল্ল মন নিয়ে বাড়ির পথ ধরেছে। আজ তার চলার ভঙ্গিই ভিন্ন রকম। তার মনে যে আনন্দের স্নিগ্ধ হাওয়া দোল খাচ্ছে তা তার চালচলন দেখেই আঁচ করা যাচ্ছে। ওই তো তার বাড়ি দেখা যাচ্ছে। একটু বাদেই দেখা মিলবে প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে। বলবে বলে মনের মাঝে অনেক কথাই লোকিয়ে রেখেছে। অনেক দিন পর বাড়িতে যাচ্ছে। বাড়ির অদূর থেকে একলোক গলা ছেড়ে চিৎকার করে ডাকছে, "ওই ভাই, ওই ভাই"। আওয়াজটা বেশ চেনাচেনা লাগছে। লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে দ্রুত আসছে। কাছে আসতেই চিনতে আর বাকি নেই। "কী রে, তোর কী হয়েছে"? "ভাই, খুশির সংবাদ! আপনার স্ত্রী, মানে আমাদের ভাবী কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে"! "যাহ! এটা কোনো খুশির সংবাদ হলো! দিলি তো তুই আমার মোটটা নষ্ট করে"! মুহুর্তেই তার চেহারায় মলিনতা এসে ভিড় জমায়। এখন তার চেহারা ধারণ করেছে ধুসর বর্ণের রূপ। একটা বিদঘুটে চেহারা ও বিরক্তি ভরা সুর নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। স্ত্রী কে আর কী ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করবে। তার মেজাজে যে আগুন লেগেছে! বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেই বলছে, "এই সংবাদ শুনার আগে আমার মৃত্যু হলো না কেন? আমি এখন মুখ লোকাবো কোথায়? সবাই আমাকে অপয়া বলবে। আমার বংশ খাঁটো হবে। আমি যদি এখন মাটির নিচে চলে যেতে পারতাম! অথবা চলে যেতে পারতাম অজানা কোনো রাজ্যে, যেখানে আমাকে কেউ চিনতে পারবে না। বলবে না আমাকে কোনো কটু কথা"। জাহেলী যুগে কন্যা সন্তান জন্ম গ্ৰহণ করলে এভাবেই কন্যার বাবা বিলাপ করতো। কুরআন এই চিত্রটাই এভাবে নিয়ে এসেছে,

    وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلۡأُنثَىٰ ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدࣰّا وَهُوَ كَظِیمࣱ

     یَتَوَ ٰ⁠رَىٰ مِنَ ٱلۡقَوۡمِ مِن سُوۤءِ مَا بُشِّرَ بِهِۦۤۚ أَیُمۡسِكُهُۥ عَلَىٰ هُونٍ أَمۡ یَدُسُّهُۥ فِی ٱلتُّرَابِۗ أَلَا سَاۤءَ مَا یَحۡكُمُونَ

    তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সুসংবাদ দেয়া হয় তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা সত্ত্বেও কি তাকে রেখে দিবে নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তারা যা সিদ্ধান্ত করে তা কত নিকৃষ্ট! (সূরা নাহল, ১৬/৫৮-৫৯)

    প্রিয় পাঠক! এই চিত্রটাকে আপনি শুধু জাহেলী যুগের সাথে রেখে দিচ্ছেন? মনে মনে ভাবছেন জাহেলী যুগের মানুষ কত খারাপ ছিল! বিস্ময়বোধ করছেন আপনি? আপনার চোখ তো চড়কগাছ হবে, যদি আমি আঙ্গুল উঁচিয়ে আপনাকে দেখিয়ে দেই আপনার পাশের বাড়িতে জাহেলী যুগের এই কাজ হচ্ছে! আপনার চাচাতো ভাই তার স্ত্রীর সাথে এমন আচরণ করছে। প্রথম কন্যা সন্তান জন্ম গ্ৰহণের পর পরের সন্তানও কন্যা হওয়ার কারণে আপনার চাচাতো ভাই তার স্ত্রীকে মারধোর করছে। কষিয়ে গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছে! দেখে আসার জন্য আপনি এখন আপনার ছোট বোন কে পাঠান । এখনো তার গালে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ রয়ে গেছে। এখনো আমাদের মাঝে জাহেলী যুগের কাজ বিদ্যমান আছে। কন্যা সন্তান জন্ম গ্ৰহণ করলে আমরা মনোক্ষুণ্ন হই। আত্মপীড়ায় ভোগতে থাকি। নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে অপয়া, অশুভ মনে করি। অপরিচিত ব্যক্তির ন্যায় আচরণ করি। শরীরের সবটুকু শক্তি ব্যয় করে তাকে বেদম প্রহার করি। তার আত্মীয়স্বজন, বংশ নিয়ে গালিগালাজ করি। ওই সময় আপনার স্ত্রী অঝোরে লোকচক্ষুর আড়ালে অশ্রু বৃষ্টি বর্ষণ করে। ভেতরের দহন যন্ত্রনার কথা কারো কাছে বলতে পারে না।  শুধু নিরবে নিভৃতে একা একা কাঁদে, যা তার রব ও সে জানে। অনেক অযোগ্য, মূর্খ স্বামী একধাব এগিয়ে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়। সোজাসাপ্টা তালাক দিয়ে তার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এই স্বামী, আপনার মাঝে জাহেলী যুগের মানুষের বৈশিষ্ট্য আছে। আপনি মূর্খ, আপনি ভরভর। আপনার স্ত্রী কি নিজ থেকে কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে? সন্তান হওয়ার পেছনে কি তার কোনো হাত আছে? তার হাতে যদি ছেলে মেয়ে হওয়ার ক্ষমতা থাকতো তাহলে সে কি কখনো মেয়ে সন্তান জন্ম দিতো? সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে এটা তো আল্লাহর হাতে,

    لِّلَّهِ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَ ٰ⁠تِ وَٱلۡأَرۡضِۚ یَخۡلُقُ مَا یَشَاۤءُۚ یَهَبُ لِمَن یَشَاۤءُ إِنَـٰثࣰا وَیَهَبُ لِمَن یَشَاۤءُ ٱلذُّكُورَ أَوۡ یُزَوِّجُهُمۡ ذُكۡرَانࣰا وَإِنَـٰثࣰاۖ وَیَجۡعَلُ مَن یَشَاۤءُ عَقِیمًاۚ إِنَّهُۥ عَلِیمࣱ قَدِیرࣱ

    আসমানসমূহ ও জমিনের আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন অথবা তাদের কে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা তাকে বন্ধ্যা রাখেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাবান।(সূরা শুরা, ৪২/৪৯-৫০)

    আপনার মাঝে কি একটু দ্বীনের জ্ঞান নেই? কীভাবে আপনি নির্লজ্জের মতো আপনার স্ত্রীকে মারছেন? অনেক পুরুষ কে দেখেছি, দেখেছে আমার চক্ষুদ্বয় তিনটা মেয়ে সন্তান হওয়ার কারণে তাকে তালাক দিয়ে আরেক নারীকে বিয়ে করেছে। আমি আবারও বলছি, আপনার মাঝে জাহেলী যুগের মানুষের বৈশিষ্ট্য আছে। এখনই স্ত্রীর কাছে মিনতি করে ক্ষমা চান। বলুন, আমার ভুল হয়ে গেছে, আমাকে ক্ষমা করো। আমার উপর বিতাড়িত শয়তান জয়লাভ করেছে। তাই আমি তোমাকে  মেরেছি। 

    প্রিয় ভাই! আমি হলফ করে আপনাকে একটা কথা বলছি, এই কন্যা সন্তান আপনার ঘরের বরকতের কারণ হবে। আপনার রুজিরোজগার বৃদ্ধি পাবে। আর অবশ্যই এটা হবেই। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই আপনাকে অনেক টাকা পয়সা দান করবেন। কারণটা জানেন কী? নারীরা হচ্ছে দুর্বল। আপনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাদের রিযিক দিবেন। আপনার কি মনে আছে, বিয়ের আগে জানি আপনি মাসে কত টাকা ইনকাম করতেন? হ্যাঁ, অবশ্যই মনে আছে। বিয়ের পর দেখুন তো আপনার এই বাড়তি টাকা কোত্থেকে আসছে? এখন আগের তুলনায় একটু বেশি ইনকাম হয়। কেন হয়, কীভাবে হয়, কার জন্য হয় কোনো দিন কি চিন্তার দরিয়ায় অবগাহন করেছেন? মধ্যরাতে কি ভেবেছেন কীভাবে এখন বেশি টাকা ইনকাম হয়? আগে তো এতো পরিশ্রম খাটুনি করেও এতো টাকা ইনকাম করতে পারতাম না! আপনার স্ত্রী যখন তার বাবার কাছে ছিল তখন আল্লাহ তাআলা তার রিযিকটা তার বাবার মাধ্যম দিয়েছেন। এখন সে আপনার স্ত্রী, তাই আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে তার রিযিক দিচ্ছেন। সে জন্যই এখন আপনি বেশি টাকা ইনকাম করতে পারেন। আপনার কন্যা সন্তান জন্ম গ্ৰহণ করেছে তার রিযিক আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে দিবেন। তাই রিযিক নিয়ে কখনো দুঃশ্চিন্তায় থাকবেন না।

    একটা কথা মনের মাঝে গেঁথে রাখুন। নবী রাসুলরা হচ্ছেন কন্যার বাবা। আমাদের প্রিয় নবীর চারজন কন্যা সন্তান ছিল। আপনি কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ভালো মানুষ? তাঁর যদি কন্যা সন্তান হয় তাহলে আপনার হলে সমস্যা কি? নবী রাসুলদের মতো আপনিও কন্যা সন্তানের বাবা। এই লকব পেতে কি আপনার মন সায় দেয় না? কখনো চিন্তা করবেন না। দেখুন, আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে  কত বড়ো বড়ো উপহার দিচ্ছেন।

     ‏ "‏ مَنْ كَانَ لَهُ ثَلاَثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ وَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَتِهِ - كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‏"‏ ‏.‏

    কারো তিনটি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করলে, যথাসাধ্য তাদের পানাহার করালে ও পোশাক-আশাক দিলে, তারা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে অন্তরায় হবে। ( ইবনে মাজাহ, হা/ ৩৬৬৯)

     "‏ مَا مِنْ رَجُلٍ تُدْرِكُ لَهُ ابْنَتَانِ فَيُحْسِنُ إِلَيْهِمَا مَا صَحِبَتَاهُ أَوْ صَحِبَهُمَا إِلاَّ أَدْخَلَتَاهُ الْجَنَّةَ ‏"‏ ‏.‏

    কোনো ব্যক্তির দু’টি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করলে যত দিন তারা একত্রে বসবাস করবে, তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। (ইবনে মাজাহ, হা/৩৬৭০)

    আপনি যে আপনার স্ত্রী কে বিয়ে করেছেন, বলুন তো তিনি ছেলে নাকি মেয়ে? অবশ্যই তিনি মেয়ে। কারণ ছেলে মানুষ কে তো আর কেউ বিয়ে করে না। এখন কথা হচ্ছে সবার যদি শুধু ছেলে সন্তান হয় তাহলে এই ছেলেরা বিয়ে করবে কাদের? মেয়ে পাবে কোথায়? এজন্যই আল্লাহর সৃষ্টির কারিশমা বড়ই নিখুঁত। তিনি কাউকে ছেলে আবার কাউকে মেয়ে আবার কাউকে দুটিই দান করেন। আপনাকে আমি একটা ভরসার বাণী শুনাচ্ছি। আপনার চারজন কন্যা সন্তান আছে? কোনো টেনশন নেই। আপনি অন্তত নিশ্চিত থাকতে পারেন আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে না, লুটোপুটি খেতে হবে না বৃদ্ধ বয়সে মলমূত্রের সাথে। আপনার অসুখ বিসুখ হলে এই কলিজার টুকরোরা দুর্বার গতিতে আপনার কাছে ছুটে আসবে। আপনার ক্ষীণকায় দেহের যত্ন নিবে, ময়লা কাপড় ধুয়ে দিবে, অপরিচ্ছন্ন অপরিপাটি ঘরদোর পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করে দিবে। ছয় ছেলের বাবা মা কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে আছে। কিন্তু ছয় মেয়ের বাবা মা বৃদ্ধাশ্রমে নেই। একজন না একজন আপনাকে ঠাঁই দিবেই। নয় কন্যা সন্তানের মাকে দেখেছি আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে নাতিপুতি নিয়ে খুব ভালোভাবে দিন কাটাচ্ছেন। আবার এও দেখেছি চার ছেলের মা মানুষের ধারে ধারে ভিক্ষা করে চলছে। তাই আপনাকে বলছি আপনি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে কন্যা সন্তান জন্ম গ্ৰহণ করায় মনোক্ষুণ্ন হবেন না। এটা জাহেলী যুগের মানুষের বৈশিষ্ট্য। আপনার মাঝে যেন এই বৈশিষ্ট্য না থাকে। 

    অনেক বাবা তো কন্যা সন্তান কে রাগ করে লেখাপড়াই করান না। বলেন, মেয়ে মানুষ এতো লেখাপড়া করে কী হবে! যত্তই লেখাপড়া করুক, দিনশেষে পাতিল মাস্টার। মানেটা মনে হয় আপনি বুঝেননি। যত শিক্ষিত নারীই হোক তাকে কিন্তু রান্নাবান্না করতে হয় এটাই বুঝাতে চাচ্ছেন তিনি। ছেলে কে স্কুলে পড়ান, বিকেলে বাড়িতে শিক্ষক রেখে আলাদাভাবে পড়ান, তার জন্য আলাদা যত্ন, কিন্তু মেয়ের বেলায় একেবারে অনিহা প্রকাশ করেন। বলেন, ক্লাস নাইনের পরেই বিয়ে দিয়ে দিবো। এত্ত লেখাপড়ার দরকার নেই। আমি একটা লোককে দেখেছি, তার তিনটা মেয়ে ছিল। কোনো ছেলে ছিল না। বড় মেয়েকে পনেরো বছর বয়সে আর মাঝারো মেয়েকে এগারো বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন।তিনি বলেন, মেয়ে মানুষ এতো লেখাপড়া করে কী হবে! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপদ বিদায় করা যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তাদের মতামত না নিয়ে, বয়সে তাদের দুইগুণ বড় ছেলের সাথে তাদের বিয়ে দিচ্ছে! আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন! প্রিয় ভাই! আপনাকে একটা কথা বলি, আপনি যদি বুখারীর জগত বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্ৰন্থ ফাতহুল বারী পড়েন তাহলে সেখানে দেখতে পাবেন হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহিমাহুল্লাহ তার কিতাবে প্রায় জায়গায় একটা বর্ণনা এভাবে নিয়ে এসেছেন, "কারিমার বর্ণনা অনুযায়ী এমন"। এর মানে হচ্ছে কয়েকজন মুহাদ্দিস ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ এর কিতাবের পান্ডলিপি লেখেছেন। তাদের মাঝে একজন হচ্ছেন কারীমা। তিনিও পান্ডলিপি লেখেছেন। তার পান্ডলিপিতে বর্ণনাটা এভাবে এসেছে সুবহানাল্লাহ! একজন মেয়ে মানুষ মুহাদ্দিস! আপনি কি কল্পনা করতে পারেন? একজন মেয়ে কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে করলে মুহাদ্দিস হতে পারে! আমি প্রায়ই কারীমা নাম্মী এই মুহাদ্দিস মেয়েকে নিয়ে ঈর্ষা করি। ইশ! আমি যদি তার মতো হতে পারতাম! হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহিমাহুল্লাহ এর মতো এত বড় একজন বিদ্বান কত সম্মানের সাথে তার নাম উল্লেখ করতো। আহ! আমার মেয়ে যদি এমন হতো! আপনার কি মন চায় না আপনার মেয়ে এমন হোক? আমার তো খুব মন চায়, হায় আল্লাহ! আমার মেয়ে যদি এমন হতো! আপনার মেয়ে হয়েছে এজন্য তাকে অবহেলা করে রেখে দিয়েন না। তাকে পড়ালেখা করান। সেও যোগ্য হবে ইনশাআল্লাহ। দেখুন দেশে বর্তমানে ভুরি ভুরি নারী যোগ্যতা সম্পন্ন ডাক্তার আছে। একটা সময় সিজার করার জন্য নারী ডাক্তার পাওয়া যেত না। এখন আলহামদুলিল্লাহ অনেক পাওয়া যায়! আপনার কি মনে চায় না আমার মেয়ে মানুষের অন্তরের ডাক্তার হবে! মানুষের দেহের রোগ নির্ণয় করার জন্য তো কত নারী ডাক্তার আছে! আমার মেয়েটা মানুষের অন্তরের রোগ নির্ণয় করবে! আমার মেয়েটা কারীমার মতো জগত বিখ্যাত বিদুষী হবে! আমার মেয়ে মানুষের অন্তরের চিকিৎসা করবে! আজ নারীদের মাঝে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুফতি নেই বললেই চলে! কিন্তু অসংখ্য ডাক্তার আছে! আপনি আপনার মেয়েকে মুহাদ্দিস বা মুফাসসির অথবা মুফতি বানান! নারীদের গোপন অনেক মাসালা তারা চোখলজ্জায় অনেক সময় আলেমদের কাছে বলতে পারে না। আপনার মেয়ে কে মুফতি বানান। বাড়িতে বসে বসে আপনার মেয়ে নারীদের গোপন মাসালাগুলোর সমাধান দিবে! আপনার মেয়ে বাড়িতে থেকে যে সকল নারী কুরআন পড়তে পারে না তাদের কুরআন শিখাবে। দৃষ্টিভঙ্গি একটু পরিবর্তন করুন। পৃথিবীতে তো আর সব সময় বেঁচে থাকবেন না। আপনি মরেও অমর থাকবেন। কবরে শুয়ে শুয়ে নেকি পাবেন। শুনুন, আমাদের মা আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু আনহা কিন্তু নারী ছিলেন! তিনি কিন্তু মুহাদ্দিস ছিলেন। তার সময়ে বড় বড় সাহাবী, তাবেঈ কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তাদের কাছে ওই বিষয়ের জ্ঞান না থাকলে সরাসরি চলে যেতেন আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রহিমাহুল্লাহু আনহার কাছে। তিনি সুন্দর করে দলীলের আলোকে বুঝিয়ে দিতেন। আপনি আপনার মেয়ে কে নারীদের জন্য একটা আদর্শ রেখে যান। আমি অনেক বাবাকে দেখেছি চারটি মেয়ে জন্ম গ্ৰহণ করার কারণে তাদের আদর করে না। সারাক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করে, ধমক দিয়ে কথা বলে। মেয়েদের দেখলেই যেন তার মাথায় খুন চাপে। এটা আদতেই ঠিক নয়। মেয়েদের সাথে এমন আচরণ করবেন? এই মেয়েদের কী দোষ? স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাদের সৃষ্টি করেছেন। আপনি কি আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট? আপনার এই মনোভাব পরিহার করুন।

    প্রিয় পাঠক! মেয়ে দেখে আপনার কলিজার টুকরো কে অবহেলা করিয়েন না। নাক ছিটকায়েন না। তাকে যোগ্য করুন। জাহেলী যুগের মানুষের মতো আপনি আচরণ করবেন না।

    আল্লাহ তাআলা আপনার সহায় হোন। আমীন 


    এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করছি।

    মাঝে মধ্যে আমরা নিজ সন্তানদের নিয়ে অহংকার করি। অন্যের সন্তানদের দেখলে নাকছিটকাই। এটা আদৌ কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা এতে অসন্তুষ্ট হন। আমার আপনার ছেলে - মেয়ে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী হলে বা সুঠাম দেহের অধিকারী হলে আমাদের মধ্যে আত্মাহংকার চলে আসে।একবারের জন্যও ভাবনার পৃষ্ঠাটা উল্টিয়ে দেখি না। সুন্দর- কুৎসিত, ল্যাংড়া, কানা, সুস্থ- অসুস্থ, সবল- দুর্বল সবই আল্লাহর সৃষ্টি। খাটো মানুষ গুলোকে নিয়ে আমরা কত মশকরা করি।  এগুলো মোটেও কাম্য নয় ।আল্লাহ ইচ্ছে করলে আমাকে কদাকার, অন্ধ, ল্যাংড়া করে সৃষ্টি করতে পারতেন।  তিনি তা না করে আমাকে সুস্থ সবল করে সৃষ্টি করেছেন।  এই মুহূর্তে এ সকল মানুষ দেখে আমাদের আল্লাহর প্রশংসা, মহিমায় নিমগ্ন হওয়া উচিত।  কত মানুষের উপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন! জীবন চলার ক্ষেত্রে আমরা অনেক মানুষ বিকলাঙ্গ দেখি , তখন চেহারা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলি।  আল্লাহ তাআলা চাইলে তো আমাকে এমন করে সৃষ্টি করতে পারতেন। যে লোকটি বিকলাঙ্গ, এই বিকলাঙ্গ হওয়ার পেছনে তার কি কোন হাত আছে?  কেউ কি চায় কখনো বিকলাঙ্গ, অসুস্থ হতে? এ মুহূর্তে যদি আমরা তাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করি তাহলে প্রকারন্তরে আল্লাহকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করলাম । কারণ তাকে মহীয়ান গরীয়ান রব সৃষ্টি করেছেন ,  এতে বিন্দু পরিমান তার হাত নেই ।  যদি হাত থাকতো তাহলে তো সে সুস্থ সবল থাকতো।  আমরা যদি তাদের নিয়ে মজা করি 'কানা, ল্যাংড়া'  বলি, উপহাস করি তাহলে আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট হয়ে আমাদের সন্তানদের এমন করে সৃষ্টি করতে পারেন।(আমরা  আল্লাহর কাছে এ ধরনের জঘন্য কথা বলা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি )

    তাই নিজের সন্তান যদি দেখতে সুন্দর, সুস্থ, সবল হয় তাহলে বেশি বেশি আল্লাহর প্রশংসায় আত্মমগ্ন হওয়া ।  তাহলে কখনো আল্লাহ তায়ালা আমাদের এমন সন্তান দান করবেন না ইনশাআল্লাহ।  সাথে সাথে তাদের দেখলে মনে মনে অগোচরে হাদীসে বর্ণিত দোয়া পড়া উচিত,

    الحمدُ للهِ الذي عافَانِي مِمَّا ابْتلاكَ به ، و فَضَّلَنِي على كَثيرٍ مِمَّنْ خلق تَفضِيلًا 

    "সমুদয় প্রশংসা ওই সত্তার নিমিত্তে, যিনি আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছেন ওই পরীক্ষা থেকে, যা দিয়ে তোমাকে পরীক্ষা করেছেন এবং অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।"

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "  কেউ যদি কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখে এই দোয়া পড়ে তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে এই রোগ থেকে মুক্তি দান করবেন।"  অর্থাৎ তার ওই রোগ হবে না। (জামেউস সাগীর ৪৬৬৭) 

    বর্তমানে আমাদের মেয়েদের মাঝে একটা প্রতিযোগী মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। মেয়েরা শিক্ষিত হবে এ কথাই শিরধার্য। মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে নিজ ছেলে মেয়ে কে পড়াবে, মানুষের মতো মানুষ করবে। আবারো বলছি মেয়েরা শিক্ষিত হবে।কিন্তু তাই বলে কী বাড়ির সব কাজকর্ম ফেলে চাকরি করতে হবে? স্বামী স্ত্রী দুজনই যদি চাকরি করে তাহলে তাদের সন্তান লালন পালন করবে কে? আল্লাহ তাআলার পরিকল্পনা কত সুন্দর, নিপুণ ও নিখুঁত। পুরুষ কে তিনি বাড়ির বাহিরে হাড়ভাঙা খাটুনি ও পরিশ্রম করার জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর নারীকে নির্ধারণ করেছেন বাড়ির ভেতরের সব কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য। পুরুষ বাড়ির বাহিরে রাজা আর নারী বাড়ির ভেতরে রাণী। আল্লাহর এই পরিকল্পনার যারাই উল্টো চলেছে তাদের জীবনেই নেমে এসেছে কষ্ট, বিষণ্নতা, লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা। পারিবারিকভাবে তারা শান্তিতে নেই। স্ত্রী কথা শুনে না, ছেলে মেয়ে কথা শুনে না। স্ত্রীকে একটা কাজের কথা বললে করে দেয় না, মুখে মুখে তর্ক করে আরো কত অভিযোগ! স্ত্রী কীভাবে কথা শুনবে, সে তো নিজেই স্বয়ং সম্পূর্ণ, সে তো আপনার টাকা পয়সার উপর নির্ভরশীল নয়। সে নিজেই তো কাড়িকাড়ি টাকা ইনকাম করে। সে কীভাবে আপনার কথা শুনবে? সে তো সারাদিন অফিসের কাজ করতে করতেই ক্লান্ত পরিশ্রান্ত, আপনার কথা কীভাবে শুনবে? সে তো সারাদিন অফিসের বসের কথা শুনতে শুনতেই কান ভারি করে ফেলেছে, এখন আপনার কথা তো বিদঘুটে তিতা লাগবেই! সারাদিন দৌড় ঝাঁপের কারণে ঠিকমতো রান্নাবান্নাও করতে পারে না। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দৌড় দিতে হয় অফিস পানে। মাঝে মধ্যে একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠলে ওইদিন আর নাস্তা করার ফুরসত মিলে না। আপনি কতদিন যে বাহিরে নাস্তা করেছেন এর ইয়াত্তা নেই। স্ত্রীকে কিছু বলতেও পারেন না। কারণ সে আপনার কন্ট্রোলের বাহিরে চলে গেছে। মানুষ মাত্রই ভালো -মন্দ দুটি দিক আছে। কোনো দিন আপনার শরীর খারাপ হয়ে গেছে। আপনি একটু আগেভাগেই অফিস থেকে চলে এসেছেন। আর এই দিকে আপনার স্ত্রী তার অফিসে কাজে ব্যস্ত। বাড়িতে এসে আপনাকে একা একাই কাতরাতে হবে। আপনার শরীর একটু আলতো করে টিপে দেয়ার মানুষ নেই। মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে। ইশ! এই মুহূর্তে যদি কেউ টিপে দিত, বিশেষ করে নিজ স্ত্রী। এটা আপনার ভাগ্যে নেই। কারণ আপনার স্ত্রী তো পরের চাকরি করে। মাঝে মধ্যে আপনার ভালো মন্দ কিছু খেতে মন চায়। কিন্তু আপনার স্ত্রী সময় করে আপনার ওই পছন্দের খাবারটা রান্না করতে পারে না। স্ত্রী চাকরি করলে যে কত সমস্যা হবে আপনার তা বলে শেষ করতে পারবো না। এই যে আমাদের মেয়েদের মাঝে চাকরি করার একটি মনোভাব এটা সৃষ্টি করেছে মিডিয়া ও সংবাদ মাধ্যম। মেয়েদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কত লেখালেখি, পোস্টার ও বিলবোর্ডে কত ছবির ছড়াছড়ি। মেয়েদের বলবো, আপনার স্বামীর আদেশ পালন করতে নিজেকে ছোট মনে হয়! মনে রাইখেন আপনি কিন্তু দিব্যি আপনার বসের আদেশ পালন করে যাচ্ছেন। এতে কি আপনার নিজেকে ছোট মনে হয় না? আপনি কারো না কারো আদেশ পালন করবেই। সেটা হয় তো হবে আপনার স্বামীর অথবা অফিসের বসের। এখন আপনি চিন্তা করুন কার আদেশ পালন করবেন। আপনার স্থামীর নাকি বসের?

    প্রিয় বোন আমার! কিছু মানুষ আপনাকে চাকরিতে লাগাচ্ছে কেন জানেন? আপনাকে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতি করার জন্য। এর পেছনে তাদের অগাধ স্বার্থ কাজ করে। একটা ছেলে কে কাজে লাগালে অনেক টাকা তাকে বেতন দিতে হয় আর আপনাকে তার অর্ধেক দিয়েও পারে। আপনার কাছ থেকে কিন্তু ঠিকই পরিপূর্ণ কাজ করিয়ে নেয়। আশপাশের মানুষদের দেখে একটা কথা একটু জোর গলায় বলতে পারবো আর তা হচ্ছে আপনার স্ত্রী চাকরি করলে টাকা আসবে ঠিক, কিন্তু প্রশান্তির সোনা পাখি উড়াল দিয়ে চলে যাবে। অনেক সময় আমরা বলি ছেলে মেয়ে কথা শুনে না। কীভাবে ছেলে মেয়ে কথা শুনবে! আপনার স্ত্রী তো কাজের বুয়ার কাছে আপনার সন্তান রেখে চাকরি করতে গেছে। কাজের বুয়া এখন যেই মনমাইনডের সে আপনার সন্তানকে সেই মনমাইনডের করে গড়ে তুলবে। তাই প্রিয় পাঠকদের বলবো, এই বিষয়গুলো নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করুন। আমরা আশাকরি আপনার মাঝে সঠিক সিদ্ধান্ত অবশ্যই আসবে।


    সাইদুর রহমান 
    Next Post Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url