বৃদ্ধাশ্রমে একদিন
বৃদ্ধাশ্রমে একদিন
কোনো এক পাতাঝরা বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে আমার বাসার পাশে অবস্থিত একটি বৃদ্ধাশ্রমে যাই। নিরিবিলি পরিবেশ; ভেতরটা বেশ পরিচ্ছন্ন। নানান রকম গাছপালা সম্মৃদ্ধ ছোট বাগান। হরেক রকম ফুল ফুটেছে বাগানের গাছে গাছে। আমার মনটা রীতিমতো বেশ পুলক অনুভব করছে। ক্ষণে ক্ষণে স্নিগ্ধ পবন ছুঁয়ে দিচ্ছে গা-গত্র। কোলাহলময়, ঝঞ্ঝাটমুখর এই শহরে এমন নিরিবিলি একটা প্লেস থাকা কম কী?
অন্তরে শিহরণ জাগানিয়ার মত একটি স্থান। বৃদ্ধাশ্রমের কক্ষগুলো মোটামুটি বড়োসড়ো ।আমার মার বয়সী এক মহিলা করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। কী যেন মনে করে আমি তার পাশে বসে পড়লাম । এরই মাঝে পরিচয়পর্ব শেষ করে ফেললাম। মহিলাকে আমি তার সন্তানদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তার এখানে আসার কারণও জিজ্ঞেস করলাম।
আমার এই আচানক প্রশ্নে তিনি খানিকটা বিব্রত বোধ করলেন । একটু নড়েচড়ে বসেন ।আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ফেললেন । এ নিঃশ্বাসে আনন্দের ছাপ ছিল না; ছিল একরাশ বিষণ্ণতা ও অপ্রাপ্তির রেখা। বিষয়টা ঠাহর করতে আমার বেগ পেতে হয়নি। উৎসুক ভঙ্গিতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'মা আপনি এখানে কেন? আর আপনার সন্তানরা কোথায়? তারা কি বেঁচে নেই? আমার আকস্মিক দু'তিনটা প্রশ্নে মহিলাটা হকচকিয়ে গেলেন। তার ফর্সা উজ্জ্বল চেহারাটা হঠাৎ পাংশুটে বর্ণ ধারণ করলো।
আমার কাছে তার জীবনের উপাখ্যান লুকানোর মানসে বলেন, জানো বাবু, আমার চারটা ছেলে ও দুটো মেয়ে আছে। সবাই তোমার মতো বড়। রীতিমতো আমাকে সমানতালে ভালোবাসে। চোখের আড়াল হতে দেয় না। আমার চার ছেলে; চারজনেরই আটতলা ভবন আছে। মেয়েরা থাকে দূর প্রবাসে। এই বড় বড় আকাশচুম্বী বিল্ডিং আমার ভালো লাগে না । নিজেকে বন্দী বন্দী মনে হয়, নিঃশ্বাস নিতে যথারীতি কষ্ট উপলব্ধি করি আমি। তাই নিজ থেকেই এই নীরব স্থানে চলে এসেছি ।এখন আমি বেশ ভালো আছি, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি।নাতি পুতিরা আমাকে বিরক্ত করে না।এখানের কর্মীরা নিয়মিত খাবার দাবার দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে আমার মনটা বড়ই ফুরফুরা। বৃদ্ধ বয়সে এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী?
মহিলা কথাগুলো বলছিল হাসিমুখে। কিন্তু তার চেহারা লুকোবে কোথায়? দয়াময় আল্লাহ মানুষের চেহারাকে আয়না বানিয়েছেন, যেখানে অপ্রাপ্তির মিথ্যা ছলনা উদ্ভাসিত হয়ে যায় ।কারো মনে যদি অশান্তির বায়ু প্রবাহিত হয়; কিন্তু লোকচক্ষের আড়াল করতে চায় সে ।তার এই ব্যর্থ চেষ্টা সফলতার মুখ দেখে না কভু।
মহিলার চোখ জোড়া থেকে শ্রাবণের ধারা বর্ষণ হচ্ছিল। ঘুঙ্গিয়ে কেঁদে উঠলো কয়েকবার। অঝোর কান্নার ধরুন ভেংচি কাটছিল বারবার। আমি বললাম, মা আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন । আমি আপনার 'কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা' দিলাম।
আপনি মিথ্যা বলছেন। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন। আপনার চোখ বলছে আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনার ব্যথায় আমার হৃদয় ব্যথা অনুভব করছে, পেছন থেকে আচানক কে জানি টুঁটি চেপে ধরেছে, নিশ্বাস এখনই বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমাকে একটু সিদ্ধ করুন। বলুন না, আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই না বলা উপাখ্যান ।
অশ্রুতে আমার চোখ ছলছল করছে। এই বুঝি একফোঁটা তপ্তাশ্রু গন্ডদেশ পেরিয়ে বুকে মাখামাখি করে। আমার দরদমাখা আবদার তিনি রাখলেন। বললেন, বাবা তোমাকে আমার এই করুন পরিণতির ঘটনা শোনাচ্ছি, সেখান থেকে উপদেশের পাথেয় সংগ্রহ করার মানসে। উত্তর প্রজন্ম যেন ভুলেও আমি যে পথে পা বাড়িয়েছি, তারা যেন সে পথে পা না বাড়ায়, এমন দুঃসাহস যেন কখনো না দেখায়। তারা যেন এই হৃদয় নিংড়ানো ইতিহাস থেকে আধার গ্রহণ করে।
আমার চার ছেলে ও দুই মেয়েকে শরীরের রক্ত পানি করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। তাদের যেন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সে জন্য যোগ্য করে গড়ে তুলেছি ।আমার একটা জায়গায় খানিকটা ভুল হয়েছিল, যার মাশুল আমাকে এখন এই বৃদ্ধ বয়সে কড়াগন্ডায় দিতে হচ্ছে ।
আমি তাদেরকে শুধু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। ধর্ম-কর্মের ন্যূনতম জ্ঞান তাদেরকে শিখাইনি। আমাদের বাড়ির পাশ ঘেঁষে এক পড়শীর বাড়ি ছিল। ওই পড়শীও তার ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছে ; কিন্তু আমার মাঝে ও তার মাঝে তফাৎ হলো তিনি তার ছেলেকে পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েছে।
আমি প্রায়ই দেখতাম ফজরের পরে একহুজুর তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতো। বিষয়টা আমার নজর কাড়ে। খোঁজখবর নেয়ার পর জানতে পারলাম এই হুজুর নাকি তার ছেলেকে কুরআন শিখান, ইসলামী শিষ্টাচার শিক্ষা দেন, তুলে ধরেন নবী চরিত্রের গল্পের পাতা।
এই বিষয়টি আমার কাছে মোটাদাগে গুরুত্ব পায়নি। বিষয়টি এমন নয় যে, আমি ধর্ম পালনে অনীহা প্রকাশ করেছিলাম। আমার অবচেতন মন আমাকে ধোঁকায় ফেলেছিল । আমি আমার সন্তানদের শুধু একমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। ধর্মীয় রীতিনীতি শিষ্টাচার তাদের শিক্ষা দেইনি। আমার সেই পড়শী আজ নাতিপুতিদের আমোদ-প্রমোদে আছে। তার দিনগুলো কাটছে এক আনন্দঘন পরিবেশে। নাতি নাতনীদের সাথে দাবাদাবি, ছুটাছুটি, খুনসুটি আরো কত কী করে তার দিনগুলো পার হচ্ছে! আর আমার পরিণতি হয়েছে এক নির্জন কুটিরে। আমার সন্তানদের এই বিশাল আটতলা ভবনের কোনো একটি কক্ষ আমার ভাগ্যে জুটলো না। তাদের গগনচুম্বী প্রাসাদ আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা যদি আমাকে বারান্দায় থাকতে দিতো, আমি মুখ বুজে মেনে নিতাম।
তিনি বলছিলেন, আমার মেয়েরা কানাডায় স্বামীর সাথে থাকে। সেখান থেকে মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেয়। তিনি কথা বলছেন আর দীর্ঘ শ্বাস নিচ্ছিলেন, তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল। তথাপি অবলীলায় তিনি বলে যাচ্ছিলেন। বৃদ্ধ মহিলাটি কথা সমাপান্তে বললেন, "বাবা তোমাকে একটা অনুরোধ করবো, তুমি যদি রাখতে।"
আদতে মহিলাটি ভদ্র ছিল ।তার কথাবার্তা থেকে আঁচ করতে পেরেছিলাম।কথাগুলো যথেষ্ট সাজানো গুছানো ছিল । আমি বললাম, "বলুন আপনি।"
তিনি বলেন, "এই চিঠি চারটি আমার চার ছেলের কাছে একটু কষ্ট করে পৌঁছে দিবে।" আমি বললাম, "ঠিক আছে। তবে আপনি অনুমতি দিলে আমি চিঠিগুলো খুলে একটু পরখ করতে চাই।"
মহিলাটি মানা করলো না আমাকে, মাথা নেড়ে সায় দিলেন। চিঠিতে লেখা ছিল।
" প্রিয় বৎস! আশা করি মহান রবের কৃপায় যথেষ্ট ভালো আছো। আমাকেও আল্লাহ তোমাদের থেকে বহুদূরে ভালো রেখেছেন । জীবন থেকে দু'টো বসন্ত গত হলো। আমাকে দূর থেকে একপলক দেখার মত তোমাদের ফুরসত মিলল না । আজ বয়সের ভারে আমার চেহারা সজিবতা হারিয়ে ফেলেছে, দেহাবয়ব ক্ষীণকায় জীর্ণশীর্ণ, দেখতে বিদঘুটে লাগে।
তোমাদের মনে আছে কী না জানি না। তোমরা যখন খুব ছোট্ট ছিলে, এমনও দিন গত হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে 'আম্মু আম্মু' রব তুলে আমাকে চুমু খেতে । আমিও যথারীতি পুলক অনুভব করতাম । হুড়োহুড়ি ছুটোছুটিতে সারা ঘর মাতিয়ে তুলতে।একটি বারের জন্যও আমি বিরক্ত অনুভূব করতাম না। তোমাদের ছ'ভাইবোনকে আমি একাই আগলে রাখতে পেরেছি; কিন্তু তোমরা আমি একা মানুষকে রাখতে পারলে না?
প্রশ্নবাণে আমাকে ভাসিয়ে দিতে। আমি কিন্তু বহতা নদীর ন্যায় শান্তজলে ভাসতাম। মুচকি হাসি দিয়ে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর তোমাদের সামনে মেলে ধরতাম। এখন আমি একটু বেশি প্রশ্ন করি বিধায় আমাকে দূরে ঠেলে দিলে, আমি একটু বেশি কথা বলি বিদায় আমাকে অন্ধকারে রেখে দিলে? আমি কিন্তু তোমাদের কখনো দূরে ঠেলে দেইনি। এখন পর্যন্ত তোমরা আমার হৃদয়ের গহীনে।
তোমাদের প্রসবের দিন কেমন যন্ত্রনা পোহাতে হয়েছে আমার, তা বলে বোঝানোর মত পৃথিবীর অভিধানে কোনো শব্দ নেই। সাদা কাগজের বুকে লেখে উপলব্ধি করানো সম্ভব নয়। তথাপি তোমাদের দুরন্তপনায় আমি সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম।
আমার ছোট্ট একটি উদরে তোমরা ভাইবোনরা ছিলে, আমার জীর্ণ বুক তোমাদের আগলে রেখেছিল শীত-গ্রীষ্মে। আমার আঁচল ছিল তোমাদের রক্ষাকবচ । বিড়ালের ভেংচি বা কুকুরের 'ঘেউ ঘেউ' শব্দে যখন ভয় পেয়ে দৌড়ে আমার কোলে আসতে, তখন আমি কত অভয় বাণী শুনাতাম তোমাদের। 'ওলে আমার সোনা মানিক, কাঁদে না। এই তো আমি, তোমার কিছু হবে না।' রাতে যখন নির্ঘুম চেয়ে থাকতে,তখন আমি ঘুমপাড়ানির গান শুনিয়ে তোমাদের চোখের রাজ্যে ঘুম নিয়ে আসতাম।
আমার ছোট্ট উদরে তোমাদের ঠিকই জায়গা হয়েছে; কিন্তু তোমাদের গগনচুম্বী প্রাসাদে আমার ঠাঁই হলো না। মাঝে মধ্যে রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়; কেউ নেই একগ্লাস পানি দেয়ার মতো নেই।মাথায় মাঝে মধ্যে চিনচিনিয়ে ব্যথা করে, একটু তেল মালিশ করার মতো কেউ নেই!
তোমাদের ওপর আমার কোনো অভিযোগ অনুযোগ নেই। সবকিছু ভুলে থাকতে আমি খুব চেষ্টা করছি। তোমরা সুখে থাকো।হ্যাঁ, অনেক সুখে রাখুন অসীম দয়ালু আল্লাহ।এটাই আমি কায়মানোবাক্যে রবের কাছে ফরিয়াদ জানাই। পরিশেষে শুধু একটা কথা বলবো," তোমাদের সন্তানদের কিন্তু একটু দ্বীনী শিক্ষা দিয়ো।আমি চাই না আমার পরিণতি তোমরা বরণ করো।
ইতি: হতভাগিনি তোমাদের মা।
চিঠিটা পড়ে আমি চোখে অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। আমি না বলতেই টপ করে ঝরে গেল। চোখের বালির বাঁধ ভেঙ্গে অশ্রুবাণ তলিয়ে দিল সারি সারি দাঁড়ানো চোখের পাপড়িগুলোকে।
চিঠির ভাব কত সুন্দর, আবেগময়! একটা অভিযোগ বা বদদোয়ার রেশ নেই। আদতে পৃথিবীতে মারা এমনই হয়ে থাকে,যারা গোটা জীবন নিস্বার্থভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো সন্তানদের পেছনে বিলি করে।
আল্পনা, যে সন্তানরা তার মার সাথে এমন অমানবিক আচরণ করতে পারে মহান রব তাদের সাথে কীভাবে কথা বলবেন?
বর্তমানে বলতে গেলে প্রতিটি পরিবারে পিতা-মাতা অবহেলিত।হরহামেশা তাদের ধমক দেয়া হয়। চোখ রাঙ্গিয়ে কথা বলা হয়।তারা শুধু টলমল নয়নে তাকিয়ে থাকে, চোখ বুজে সয়ে যায়।
অনেক অথর্ব সন্তান তো নিজ কাপড়-চোপড় মাকে দিয়ে ধৌত করায়; এমনকি স্ত্রীর কাপড়ও! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি কিয়ামতের আলামত হিসেবে বলেছিলেন,
إِذَا وَلَدَتِ الْمَرْأَةُ رَبَّتَهَا
" যখন দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে।"(বুখারী ৪৭৭৭)
অর্থাৎ দাসীর সাথে মনিব যেমন আচরণ করে, এমন আচরণ করবে নিজ সন্তান।
Rafsan Jani
.jpeg)