দেয়ালের ওপাশ থেকে বলছি
গ্ৰীষ্মের কয়লা পুড়া রোদ। মাঠ - ঘাট ফেটে চৌচির। রোদের তাপে মাঝে মধ্যে ধেয়ে আসা স্নিগ্ধ বাতাসকেও মনে হচ্ছে আগুনের ফুলকি।আজ সূর্যটা যেন ভীষণ রাগান্বিত। সবটুকু তেজ প্রকৃতিতে ঢেলে দিচ্ছে । ডানা মেলে উড়ন্ত পাখিগুলো পর্যন্ত এই রোদের তাপে উড়া বাদ দিয়ে গাছের ছায়ার তল্লাটে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। একটু পরপর সরোবর, দীঘি থেকে চোখা ঠোঁটে এক দুফোঁটো জল গলতঃকরণ করছে। গনজীবন হাঁসফাঁস করছে। এই অশান্ত পরিবেশেও মনুষ্য জীবন শান্ত নেই । ব্যস্ত নগরী ঢাকার মানুষের পা ফেলানোর জায়গা নেই। তীব্র যানজট; নড়াচড়া করবার মতো ফাঁকাস্হান নেই। সাদিয়া ও আকাশ ঢাকা শহরের একটা কিংবদন্তিতুল্য কলেজে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। দুজনের গায়েই তারুণ্যের বাসন্তি হাওয়া বইছে। সবেমাত্র জোয়ার এসেছে তারুণ্যের দরিয়ায়। প্রত্যেক দিন এক সাথেই দুজনের যাতায়াত। মাঝে মধ্যে চোখাচোখি হয় আর কী! কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলে না। আজ তারা এই তীব্র যানজটে পাশাপাশি সিটে বসেছে ।
সহসাই সাদিয়ার হাত থেকে তার পার্সটা আকাশের সামনে পড়ে যায় । যাত্রীদের ভিড়ে গাড়িতে সুঁই ফেলানোর জায়গা নেই। সাদিয়া পার্সটা নুয়ে নিতে পারছে না। আকাশ বিষয়টা উপলব্ধি করে হাত বাড়িয়ে পার্সটা নিয়ে সাদিয়ার দিকে হাত বাড়াল। আর অমনি সাদিয়ার মুখ থেকে অবচেতন মনে ফস করে 'থ্যাংকস' শব্দটা বের হয়ে যায় । আর আকাশ এই সুযোগটা লুফে নেয়। সেও বলে দিলো ' ইট'স ওকে ' । আজই তাদের প্রথম কথা হলো। সাদিয়ার লজ্জামাখা চাহনিতে আকাশও খানিকটা থতমত খেয়ে যায়। আকাশ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে বেড়ে উঠা এক মেধাবী তরুণ। স্কুল জীবন থেকে কলেজ জীবন পর্যন্ত ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে আসছে। তার বাবা ছোটখাটো একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। ছেলেকে বড় শিক্ষিত বানাবে, ছেলে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ভালো বেতনের চাকরি করবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে এটা তার বাবা মার ঐকান্তিক অভিলাষ। তাই এই ছেলের পেছনে জীবনের রক্ত ঝরা টাকা ঢালছে ।
আকাশেরও খুব ইচ্ছে বাবা মার স্বপ্ন পূরণের। তাই যথারীতি প্রচেষ্টা করতো। সে তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণের নেশায় বিভোর থাকতো। কোনো দিন মেয়েদের বা আজেবাজে বন্ধুদের পাল্লায় পড়েনি ।
কিন্তু ইদানিং সে কেমন জানি একটু আধটু সাদিয়ার সাথে ভিড়ছে। তার সাথে কথা বলতে, অবসর সময় বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে আড্ডা দিতে ভালো লাগে। পড়ালেখা আর আগের মতো ততটা করে না। কেমন জানি অন্য মনস্ক উদাসীন উদাসীন ভাব।
বিষয়টা তার মার দৃষ্টির অগোচরে নয়। কিন্তু কী জানি ভেবে আর ছেলেকে কিছু বলেনি।
দিন যায়, রাত যায় এভাবে পনেরো দিনের মাথায় একদিন পাতাঝরা বিকেলে সবুজ গালিচায় মোড়ানো দুর্বা ঘাসে বসে আকাশ সাদিয়া কে প্রপোজ করে। সাদিয়াও মানা করেনি; সাথে সাথে এক চিলতে মুচকি হাসি উপহার দেয়। এরপর থেকে শুরু হয় চুটিয়ে প্রেম করা।
আসলে ভালোবাসা এভাবেই হয়। প্রথমে ভালো লাগা আর ভালো লাগা থেকেই শুরু হয় ভালোবাসা।
নয় মাস পরের কথা। সময়টা ছিল রাত বারোটা। এই নয় মাসে দুজনের মাঝে মন দেয়া-নেয়া হয়ে গেছে বেশ। গভীর রাত, নিস্তব্ধ প্রকৃতি । বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে বিভোর। মনে হয় এই তল্লাটে কেউ জেগে নেই। এই নিঝুম রাতে দুটি প্রাণ এখনো জেগে আছে, সবার অগোচরে ফিসফিস করে প্রনয়ের আলাপ করছে । কখনো খুনসুটি কখনো বা মান-অভিমানের ঝুলি আবার কখনো বা রোমান্টিকতার সাগরে অবগাহন। কত স্বপ্ন, কত আশা ভরসা, কত প্রাপ্তির সমাহার! আকাশ এই নিস্তব্ধ রজনীতে সাদিয়ার প্রেমের আবেগময় কথায় খিলখিল করে হাসছে। তার আশার ভাতে ছাই পড়ে। লাইটের সুইচে হাত পড়ে আকাশের মায়ের ।
"কী আকাশ! এত রাতে কার সাথে কথা বলছো? এখনো ঘুমাওনি? আর দুদিন বাদেই তো তোমার ফাইনাল পরীক্ষা, এভাবে চললে পরীক্ষায় ঘোড়ার ডিম পাবে "। আরো শুনিয়ে দিল কয়েকটা কথা। আকাশ শুনে থতমত খেয়ে গেল, লা জওয়াব।
টেবিলের উপরে রাখা গ্লাস থেকে পানি খেয়ে তড়িঘড়ি করে শুয়ে পড়ে। ইন্টারের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে; কিন্তু এখনো আকাশের সাদিয়ার সাথে অগোচরে কথা বলা বন্ধ হয়নি। ক্ষণিকের ভালোবাসার মোহে পড়ে ভুলে গেছে তার পিতা-মাতার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের কথা।
আদতে প্রেম-ভালোবাসার বিষয়টা এমনই। একবার মন দেয়া-নেয়া হয়ে গেলে হাজার উপদেশ বাণীতেও কাজ হয় না। এজন্যই তারুণ্যের বসন্তকালে ভুলেও একাজে পা বাড়ানো উচিত নয়।
অনেক তরুণ মজাচ্ছলে টাইম পাস করার মানসে বা টেস্ট করার প্রত্যাশায় এই ফাঁদে পা বাড়ায়। সত্যিই, এটা চোরাবালি, দেখতে দৃষ্টিনন্দন চোখধাঁধালো মনে হলেও এটা মরীচিকা। হাজার যুবককে দেখেছি লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহী। লেখাপড়া ছাড়া কথা বলার দু'দণ্ড সময় মিলতো না । এমনকি বাবা মার সাথে এক সপ্তাহ পরপর কথা বলতো; কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় প্রতারিত হয়ে মজাচ্ছলে প্রেম করে। দেখেছি তার লেখাপড়া শেষ হয়ে গেছে। পরীক্ষায় ফেল করেছে। অথচ ছেলেটা ছিল দুর্দান্ত পরিশ্রমী ও মেধাবী । ছাত্র জীবনে প্রেম করা মানে জ্বলন্ত অঙ্গারে হাত রাখা। এখন কেউ যদি অঙ্গারে হাত রাখতে পারে তাহলে প্রেম করবে, নচেৎ বর্জন করবে। সেলফের সাথে মাথা গোঁজে কত তরুণকে দেখেছি ব্যর্থ অশ্রুপাত করতে। কত সরল প্রাণকে গুঙ্গিয়ে কাঁদতে দেখেছি । প্রেমের প্রাথমিক ফলটা খুবই মিষ্টি, সুস্বাদু ; কিন্তু এর আখেরি পরিণতি খুবই বিদঘুটে, তিক্ত পীড়াদায়ক। দিন পেরিয়ে ইন্টার পরীক্ষা শেষ। আকাশের তো খুশির অন্ত নেই । এখন থেকে কোনো বাধা-নিষেধ নেই, নেই মার বকা শোনার ডর ভয় । নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে এখন শুধু প্রেমের কল্পকাহিনী চলে। কত ভালোবাসা, কত আবেগঘন মুহূর্ত, কত কী!
একটা মাস ফুরিয়ে গেল চোখের পলকেই । আদতেই সুখের প্রহরগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্টের দিনক্ষণ এগিয়ে আসে। কোনো এক গোধূলিলগ্নে কথা । ক্ষুধার্ত পক্ষীকুল তখন পেটপুরে বাড়ি ফেরার নেশায় মত্ত। দুরন্ত ছেলেরা খেলা শেষ করে ঝিল থেকে হাত-পা ধৌত করছে। রাখালরা পালছোট গরু বাছুর কে জোরে জোরে হাকডাক দিচ্ছে। ব্যস্ত মানুষগুলো বেলা ফুরাবার আগেই বাড়ির পথে হাঁটা ধরছে। মাগরিবের আজানের আগেই বাড়ি পৌঁছতে হবে।
আকাশের মা বললো, "কীরে আকাশ, পরীক্ষার রেজাল্টের কী খবর?" "আম্মু তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না তো ! রেজাল্ট দিলে দেখবে কেমন ভালো করেছি । এখন এতো আগেভাগে কিছু বলার দরকার নেই ।" "আচ্ছা তাহলে দেখা যাবে নে ।"
মধ্যদুপুর। ঘড়ির কাঁটায় দুইটা ছুঁই ছুঁই । আকাশ ও তার বন্ধুরা উৎসুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে! কখন বহুল কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট পাবে । সবার মনে একটা আতঙ্কের রেষ প্রস্ফুটিত হচ্ছে। কী জানি কী হয়!
অপেক্ষার প্রহর এবার শেষ হলো । পরীক্ষার ফলাফল বোর্ডে ঝোলানো হলো। সবাই একসাথে হুড়োহুড়ি করে ভোঁ দৌড়। আকাশ বোর্ডের একেবারে সন্নিকটে চলে যায়। তার নামটা পলকহীনভাবে খুঁজছে । কোথায় আছে তার নাম। একবার উপরে নজর বুলায় আরেকবার নিচে। না, তার নাম কৃতকার্যদের তালিকায় নেই।
বোর্ডের একেবারে সাইটে অকৃতকার্য কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের নাম মোটা লালদাগে ঝুলছে । তার নজর পড়ে ওইদিকে। শুরুতেই তার নামটা চোখে পড়ে। তার মাথায় আসমানটা ভেঙ্গে পড়ে । ক্ষণিকের জন্য গোটা দুনিয়া আলোকময় হওয়া সত্ত্বেও তার কাছে তিমির রজনী সদৃশ মনে হয়। দু'চোখে সবকিছু আবছা আবছা দেখছে।
কাউকে কিছু না বলে অদূরে একটা টিউবওয়েল থেকে মাথায় পানি দিচ্ছে। তার গাটা উনুনের রূপ ধারণ করেছে। শরীরটা নিস্তেজ প্রায়। মনে হচ্ছে একা বাড়ি ফেরা মুশকিল হবে । কাউকে কিছু বলছে না । বাড়িতে গিয়ে মুখ দেখাবে কীভাবে? বন্ধুদেরকেই বা কী বলবে? তার মানসপটে হাজার প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে । ফর্সা চেহারাটা মুহূর্তেই মলিনতায় রূপ নিয়েছে। সে একা একা বসে আছে । এদিকে গোল্ডেন ও প্লাস পাওয়া ছাত্র - ছাত্রীরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছে। উৎফুল্লতার আতিশয্যায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী তো নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে। স্কুল-কলেজে যা হয় আর কী!
আকাশ ক্লাসের ফার্স্ট বয়। আজ তার এই দুর্গতি! এভাবে বেইজ্জতির তমকা গলায় জড়াতে হবে তা ভুলেও কল্পনা করেনি । ক্লাস ওয়ান থেকে ইন্টার পর্যন্ত সদা তার রেজাল্ট এক ছিল। এটা নিয়ে সে ও তার পরিবার রীতিমতো আপ্লুত ছিল। কিন্তু আখেরি পরিণতিটা যে এমন হবে কেউ জানতো?
আকাশ দুর্দান্ত মেধাবী ছাত্র ছিল । ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়বে, বড় চাকরি করবে , এটা ছিল তার বাবা-মার অভিলাষ। অনাকাঙ্ক্ষিত একটা ঝড়ে সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। আকাশ বিষণ্ন চেহারায়, নতশিরে বাড়িতে প্রবেশ করে।
এসেই সাদিয়াকে ফোন দেয়। রিং হচ্ছে। মোবাইলের ওপাশ থেকে সাদিয়ার উৎফুল্লতার হাসিমাখা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে । হাসির আওয়াজ থেকেই আঁচ করা যাচ্ছে যে সাদিয়ার মাঝে আনন্দের হিল্লোল বইছে। "কী খবর সাদিয়া?"
"এইতো ফোর পয়েন্ট পেয়েছি।"
" তোমার কী খবর?"
আকাশ বললো, "খুশির খবর নেই । পাস করিনি"!
" কী বলো এগুলো! আমার সাথে মশকরা করছো"?
"আরে নাহ! সত্যি ফেল করেছি।"
"তাহলে এখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিবে কীভাবে ?"
"সেটাই তো ভাবছি । পাস না করলে কীভাবে ভর্তি পরীক্ষা সম্ভব ?"
আকাশ বললো, " সাদিয়া পাশের রুমে মাকে কী যে বলবো বুঝতে পারছি না।"
সাদিয়া বললো, " এখন তো তুমি আমার এক ক্লাস জুনিয়র। ভাবছি বাবা মা আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিবেন কিনা? "
" কী বলো এগুলো! মানবে না কেন ?"
" আরে একটা সামাজিকতা আছে না? মানুষ কী বলবে! "
" মানুষ আবার কী বলবে?" মানুষ বলবে, "ছেলে মেয়ের থেকে এক ক্লাস জুনিয়র। " "সাদিয়া, তুমি আজ আমার এই দুর্দিনে আমাকে এড়িয়ে চলছো? আমার সাথে পরের মত আচরণ করছো?"
"কী অবস্থা ! আমি আবার কই পরের মতো আচরণ করলাম? আমিতো বাস্তব কথা বলছি!" "সাদিয়া তুমি ভালো করেই জানো, আমি ক্লাস ওয়ান থেকে ইন্টার পর্যন্ত ক্লাসের ফার্স্টবয় ছিলাম। তুমি আমার মেধা সম্পর্কে যথার্থই ধারণা রাখো।" "হ্যাঁ, তো। "
"তুমি আমার সাথে এমন আচরণ করছো কেন? তুমি কি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে? আমাকে ভুলে যাবে ? একবারও আমার কথা তোমার মনে হবে না? পরীক্ষার সময় আমি নিশিরাত পর্যন্ত লুকিয়ে লুকিয়ে তোমার সাথে কথা বলেছি, একটুও পড়িনি। যার কারণে আজ আমার এই দুর্গতি। আকাশ থেকে উপর হয়ে পড়লাম।" "কী! তুমি ফেল করে এখন এর দায়ভার আমার উপর চাপাচ্ছো, আমাকে দোষী সাব্যস্ত করছো? আমিও তোমার সাথে কথা বলেছি। কই আমিতো ফোর পয়েন্ট পেয়েছি।" "সাদিয়া, আমার ভালোবাসার মাত্রা অধিক ছিল। আমার মনের সবটা সময় জুড়েই তুমি ছিলে। তোমাকে নিয়ে আমার কত স্বপ্ন ছিল ! রাতভর তোমার সাথে কথা বলতাম আর দিনে ঘুমিয়ে এগুলো কল্পনার রাজ্যে বুনতাম। সত্যি সাদিয়া, আমি তোমাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি! তোমাকে ছাড়া আমার জীবন অন্তঃসারশূন্য! আমি বাঁচবো না তোমাকে ছাড়া!" "এই আবার উল্টাপাল্টা কিছু করো না যেন তাহলে আমিও ফেঁসে যাব কিন্তু !"
" ঠিক আছে করবো না। আগে তুমি বলো পূর্বের ন্যায় আমাকে ভালোবাসবে এবং তোমার বাবার কাছে আমাদের সম্পর্কের কথাটা খোলাসা করবে।"
" ঠিক আছে। তুমি টেনশন করো না। দেখি মাগরিবের পর অফিস থেকে ফিরলে আব্বুকে বলবো । আর শোনো, এখন তো আমার একটু বেশি পড়তে হবে । কারণ পাবলিক ভার্সিটিতে না টিকলেও কমছে কম ন্যাশনালে তো থাকতে হবে ! তাই আগের তুলনায় একটু কম কথা বলবো। ঠিক আছে?" "আচ্ছা ঠিক আছে।" "টেনশন করো না। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করো। আচ্ছা তাহলে এখন রাখি।"
এতক্ষণ ধরে আকাশের মা পেছন থেকে সব কথা শুনেছে । তার ফর্সা চেহারাটা মুহূর্তেই পাংশুটে বর্ণ ধারণ করে। খুটি বিহীন আসমানটা না বলেই যেন তার মাথায় পড়ে গেল। হৃদয়ে ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন বুনেছিল ! ছেলেকে নিয়ে মানুষের সাথে কত গর্ববোধ করতে ! ছেলে অনেক যোগ্য হবে, ছেলের জন্য লাল টুকটুকে শাড়ি পরিহিতাবস্থায় আলতা রাঙ্গা পায়ে একটা মিষ্টি বউ নিয়ে আসবে ! সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন চোরাবালিতে পড়লো। সবকিছু ভেস্তে গেল । গম্ভীর কণ্ঠে বললো, আজ তোমার বাবা আসুক । হ্যাঁ , আমি বুঝতে পারছি কেন তোমার এই অবস্থা! পরীক্ষার সময় রাত জেগে জেগে মেয়ের সাথে প্রেম করা। হায় হায় রে , আমার সব শেষ! এই মুহুর্তটা দেখার আগে আমার মৃত্যু হলো না কেন ! এখন মানুষের সামনে আমি মুখ দেখাবো কী করে ! বারবার ওই সময় বলেছিলাম মনোযোগ দিয়ে পড়। আমার কথা আর শুনলি না ! এখন আমি কী করি! যাপিত জীবনের সাধনা শেষ! ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে আকাশের মা তাকে তিরস্কার করতে করতে রুম ত্যাগ করে । আকাশ সিলিং ফ্যানের সুইচ অন করে একটু খাটে বসে । পরিচিত মানুষগুলো আজ আচরণ করছে অপরিচিতের ন্যায়। জীবনে কোনো দিন তার মা তাকে কটু কথা বলেনি। আজ তাকে ব্যথাতুর কিছু বাক্য শুনতে হলো । অবশ্য তার মার কান্না দেখে তার নিজের উপর খানিকটা জেদ হচ্ছে। তার কারণে তার মায়ের চোখে অশ্রু! সে তার মাকে কখনো কান্না করতে দেখেনি। ছেলেকে নিয়ে সদা হাসিখুশি থাকতো । আলাদা একটা স্বপ্ন লালন করতো।
খাটের পাশে একাকী মোবাইলটা পড়ে আছে । আচমকা বেজে উঠলো ফোনটি! ফোনের ওপাশ থেকে হৃদয়ের স্বর ভেসে আসলো ।
হ্নদয় হলো আকাশের প্রিয় বন্ধু। ছোটবেলা থেকে দুজন একসাথে বেড়ে উঠেছে। "কীরে দোস্ত, শুনলাম তুই নাকি পরীক্ষায় ফেল করেছত? শুনে ভীষণ খারাপ লাগলো ! তাই কালবিলম্ব না করে সাথে সাথে ফোন দিলাম । তোর জন্য আফসোস লাগছে । কতটা বছর একসাথে আমরা লেখাপড়া করেছি! মনের মাঝে বড় আশা ছিল একসাথে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়বো। ছায়াঘেরা রমনার বটমূলে বসে পরস্পর ক্লাসের পড়া আদান-প্রদান করবো । মাঝেমধ্যে দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাব । আশার বাসা ভেঙ্গে গেল আকস্মিক একটা ঝড়ে।"
হৃদয়ের কথাগুলো শুনে তপ্ত অশ্রুরা আকাশের চোখের কোণে ভিড় জমায়। টলমল টলমল করছে। এই বুঝি চোখের পাপড়িগুলো ভিজে যায়।
"ঠিক আছে আকাশ । মন খারাপ করিস না । আল্লাহ ভরসা। দেখা যাক। সামনে চেষ্টা কর। এখন রাখি তাহলে । " আকাশের চোখে শ্রাবণের উতলা বর্ষণ শুরু হয়েছে। কান্না আর আটকে রাখতে পারছে না । ফুঁপিয়ে কাঁদা শুরু করে ।কাঁদার দরুন ভেংচি কাটছে। নয়নের জলে তুলতুলে বালিশ ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে। সে কোনোদিন এমনভাবে শিশুর মতো কাঁদেনি । তার মুখে সদা হাসির রেখা ফুটে থাকতো। প্রশান্তির ফল্গুধারা বইতো তার হৃদয়ে। আজ নিজেকে বড় একা লাগছে। সন্ধ্যেবেলা আকাশের মা ঘুঙ্গিয়ে কেঁদে উঠলো। ছেলেকে নিয়ে কত প্রশংসা, গর্ব, অহংকার করতো। রেজাল্টের আকস্মিক একটা ধাক্কায় সবকিছু চুরমার হয়ে গেল। এজন্যই কখনো উৎসাহী হয়ে কারো ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রশংসা বা গর্ব, অহংকার করতে নেই। তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে এই অতি প্রশংসা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ কুরআনে বলছেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنْفُسَهُمْ بَلِ اللَّهُ يُزَكِّي مَنْ يَشَاءُ وَلَا يُظْلَمُونَ فَتِيلًا
"যারা আত্মপ্রশংসা করে তাদের দেখেছো? বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পরিশুদ্ধ করেন। তাদের প্রতি বিন্দু পরিমাণ জুলুম করা হবে না। " ( নিসা ৪৯)
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
"আত্মপ্রশংসা করো না। তিনি (আল্লাহ) অধিক জানেন কে আল্লাহ ভীরু।" ( নজম ৩২)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "কারো প্রশংসা করা হলো তাকে হত্যা করে দেয়া।"
মাঝে মধ্যে আমরা নিজ সন্তানদের নিয়ে অহংকার করি। অন্যের সন্তানদের দেখলে নাকছিটকাই। এটা আদৌ কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা এতে অসন্তুষ্ট হন। আমার আপনার ছেলে - মেয়ে অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী হলে বা সুঠাম দেহের অধিকারী হলে আমাদের মধ্যে আত্মাহংকার চলে আসে।একবারের জন্যও ভাবনার পৃষ্ঠাটা উল্টিয়ে দেখি না। সুন্দর- কুৎসিত, ল্যাংড়া, কানা, সুস্থ- অসুস্থ, সবল- দুর্বল সবই আল্লাহর সৃষ্টি। খাটো মানুষ গুলোকে নিয়ে আমরা কত মশকরা করি। এগুলো মোটেও কাম্য নয় ।আল্লাহ ইচ্ছে করলে আমাকে কদাকার, অন্ধ, ল্যাংড়া করে সৃষ্টি করতে পারতেন। তিনি তা না করে আমাকে সুস্থ সবল করে সৃষ্টি করেছেন। এই মুহূর্তে এ সকল মানুষ দেখে আমাদের আল্লাহর প্রশংসা, মহিমায় নিমগ্ন হওয়া উচিত। কত মানুষের উপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন! জীবন চলার ক্ষেত্রে আমরা অনেক মানুষ বিকলাঙ্গ দেখি , তখন চেহারা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলি। আল্লাহ তাআলা চাইলে তো আমাকে এমন করে সৃষ্টি করতে পারতেন। যে লোকটি বিকলাঙ্গ, এই বিকলাঙ্গ হওয়ার পেছনে তার কি কোন হাত আছে? কেউ কি চায় কখনো বিকলাঙ্গ, অসুস্থ হতে? এ মুহূর্তে যদি আমরা তাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করি তাহলে প্রকারন্তরে আল্লাহকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করলাম । কারণ তাকে মহীয়ান গরীয়ান রব সৃষ্টি করেছেন , এতে বিন্দু পরিমান তার হাত নেই । যদি হাত থাকতো তাহলে তো সে সুস্থ সবল থাকতো। আমরা যদি তাদের নিয়ে মজা করি 'কানা, ল্যাংড়া' বলি, উপহাস করি তাহলে আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট হয়ে আমাদের সন্তানদের এমন করে সৃষ্টি করতে পারেন।(আমরা আল্লাহর কাছে এ ধরনের জঘন্য কথা বলা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি )
তাই নিজের সন্তান যদি দেখতে সুন্দর, সুস্থ, সবল হয় তাহলে বেশি বেশি আল্লাহর প্রশংসায় আত্মমগ্ন হওয়া । তাহলে কখনো আল্লাহ তায়ালা আমাদের এমন সন্তান দান করবেন না ইনশাআল্লাহ। সাথে সাথে তাদের দেখলে মনে মনে অগোচরে হাদীসে বর্ণিত দোয়া পড়া উচিত,
الحمدُ للهِ الذي عافَانِي مِمَّا ابْتلاكَ به ، و فَضَّلَنِي على كَثيرٍ مِمَّنْ خلق تَفضِيلًا
"সমুদয় প্রশংসা ওই সত্তার নিমিত্তে, যিনি আমাকে পরিত্রাণ দিয়েছেন ওই পরীক্ষা থেকে, যা দিয়ে তোমাকে পরীক্ষা করেছেন এবং অসংখ্য সৃষ্টির মাঝে আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।"
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, " কেউ যদি কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখে এই দোয়া পড়ে তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে এই রোগ থেকে মুক্তি দান করবেন।" অর্থাৎ তার ওই রোগ হবে না। ( জামেউস সাগীর ৪৬৬৭)
সন্ধ্যের পর থেকে আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন । আজ আগেভাগেই রাতটা আঁধারে ঘিরে গেছে। আকাশের ব্যথার সাথে তাল মিলিয়ে খুঁটি বিহীন আসমানটাও কি ব্যথিত? বাহিরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে । বাতাসের ঝাপটায় জানালা দিয়ে শাশা বাতাস আসছে। বৃষ্টির প্রথম পর্ব থেকেই কারেন্ট নেই । আজ আকাশদের বাড়িতে সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে। বাহির থেকে গোটা বাড়িটা কে কবর কবর মনে হচ্ছে। হবারই কথা, আজ তো প্রাত্যহিক আনন্দের আমেজ নেই । সবার মন বিষন্নতায় ছেয়ে আছে। খাবার টেবিলের এক কোণে টর্চ লাইটটি মিটিমিটি করে আলো ছড়াচ্ছে। আকাশের বাবা বাড়ি ফিরেছে মোটামুটি বেশ সময় হয়েছে। আকাশের মা অভিযোগের ঝুলি আদ্যেপান্ত তার বাবার কাছে তুলে ধরেছে । নিরব নিস্তব্ধ । বাবা ছেলে খাচ্ছে। কারো মাঝে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত নেই । আকাশের বাবা এমন ভান ধরেছে, যেন কিছুই জানে না। খাওয়ার এক পর্যায়ে তার বাবা আকস্মিক প্রশ্ন ছুঁড়ে,
"কী খবর আকাশ, তোমার রেজাল্ট কী হয়েছে"?
আকাশ কিছুটা সময় নিরব রইলো।
" কী ব্যাপার, কথা বলছো না কেন"? আকাশের বাবার মুখ থেকে গম্ভীর স্বর বের হয়ে আসলো । বহুদিন পর তার বাবা অমন ধমকের স্বরে কথা বলছে। আকাশ কিছু বলার আগেই চটকরে তার মা বলে উঠে,
" ও কী বলবে, ওর বলার মতো মুখ আছে? রাতভর তো প্রেমে মজেছে । লেখাপড়া তো আর করেনি। পাস করবে কীভাবে"? আকাশের বাবা তিরস্কারের ঝঞ্ঝাবায়ুতে তার হৃদয়টা তছনছ করে দিলো। সে শুধু নিরবে সব কথাগুলো গলধঃকরণ করলো । চোখ দিয়ে অঝোর ধারা বর্ষণ হলো।
আজ বৃষ্টিরজনী । প্রকৃতি নিরব নিস্তব্ধ । তাই আগেভাগেই সব প্রাণীরা চুপ হয়ে আছে। আজ দুর অরণ্য থেকে প্রাত্যহিক দুষ্টু খেঁকশিয়ালের ডাক ভেসে আসছে না ।
আকাশের চোখের তারায় ঘুম আসছে না । শুধু শুধুই এপাশ-ওপাশ হচ্ছে। বারবার সাদিয়ার কথা মনে পড়ছে । প্রতিদিন রাতভর দুজনের মাঝে ভালোবাসার কল্পকাহিনী চলতো । কতটা সময় ব্যয় করেছে ও সাদিয়ার পেছনে! নিজ অগোচরেই হাতটা চলে যায় মোবাইলের তল্লাটে। সাদিয়া কে ফোন দেয়। ওপাশ থেকে সাদিয়ার সাড়া। "আকাশ, কী খবর"?
"এইতো কোনরকম আছি।" সাদিয়া বলছে, "তুমি ফোন না দিলেও একটু পর এমনিতেই আমি তোমাকে ফোন দিতাম"। "সত্যি বলছো সাদিয়া?"
"হ্যাঁ সত্যি; তবে বেদনাবিধুর সংবাদ নিয়ে। আমি সন্ধ্যের পর তোমার আমার সম্পর্কের কথা বাবা মাকে বলি এবং এ কথাও বলেছি যে তুমি ফেল করেছো। আমার কথা তো শুনে বাবার মাথায় খুন চেপে বসে । গোস্বায় অগ্নিশর্মা হয়ে আমাকে দু'একটা কথা শুনিয়ে দিল। শেষমেষ বলল, " এই ছেলের সাথে তোমার যায় না। তোমাকে আরো লেখাপড়া করতে হবে। ক্যারিয়ার গড়তে হবে। ভালো চাকরি করতে হবে । যা হবার তা তো হয়ে গেছে ! সব বাদ দিয়ে আগের মতো লেখাপড়ায় মনোযোগী হও এবং ওই ছেলের সাথে কথা বলা বাদ দাও"।
এরপর বাবা আমার একটা কথাও শুনলো না ।সোজা নিজ কক্ষে চলে গেল। এখন আমি কী করবো আকাশ বুঝে উঠতে পারছি না । অবশ্য অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোমার সাথে আর কথা বলবো না। যদিও এতে আমার ভীষণ রকম কষ্ট হবে এবং রীতিমতো তোমারও কষ্ট হবে। এছাড়া আমারতো আর গত্যন্তর নেই।" আকাশ বেদনার দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো ।আর বললো, "তুমি তো আমাকে কথা দিয়েছিলে ভুলে যাবে না ।আপদের ঘনঘটায় আমাকে একা ফেলে চলে যাবে না । কত প্রতিশ্রুতিই না আমাকে দিয়েছিলেন । নিমিষেই সব ভুলে গেলে? তুমি আমার কাটা ঘায়ে নুনে'র ছিটা দিলে । আদতে মেয়েরা এমনই হয়ে থাকে"। রাগে অভিমানে আকাশ ফোন কেটে দেয়।
হাজার চেষ্টা তদবীর করছে আকাশ চোখের রাজ্যে আধাঁর নামিয়ে আনতে। কিন্তু সফলতার মুখ দেখছে না। কিছুতেই ঘুম আসছে না। আর ঘুম আসবেই বা কী করে ? এমন আত্মপীড়ায় কী আর ঘুম আসে?
রাতটা আজ বেশ বড় লাগছে। আদতে বিপদের মুহূর্তগুলো বড় কঠিন, রগচটে। ধারে কাছে আসতে চায় না। দূরে দূরে থাকে । সাদিয়ার সাথে যখন কথা বলতো, তখন মুহূর্তগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যেত। রাত পেরিয়ে কখন যে প্রভাত হয়ে যেতে টেরই পাওয়া যেত না। বিছানায় এপাশ ওপাশ হতে হতে ফজর নাগাদ তার চোখের মণিকোঠায় ঘুমরা এসে ভিড় জমায়। সকাল দশটা পার হয়ে গেছে । এখনো আকাশ ঘুমে বুঁদ হয়ে আছে। এতোক্ষণে সূর্য উঠে পৃথিবীর বুকে ঝিলমিল ঝিলমিল করছে। রোদের প্রখরতা ক্রমেই বাড়ছে।আকাশের মা বাহিরে পেনপেন ভ্যানভ্যান করছে। চেঁচামেচির আওয়াজে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ ডলতে ডলতে শোয়া থেকে উঠে পড়ে। হুড়মুড় করে উঠে ফ্রেশ হয়ে অল্প নাস্তা করে। এদিকে তার মার আর মুখ বন্ধ নেই। সকাল থেকেই বকবক করছে। আকাশ ওদিকে কান না দিয়ে গদগদ করে গিলছে। নাস্তা সেরে আনমনে একা একা তার রুমে বসে আছে। বারবার সাদিয়ার কথা মনে পড়ছে । কীভাবে সে তাকে ছেড়ে চলে গেল । পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে যতটা কষ্ট পেয়েছে, এর চেয়ে ঢের কষ্ট পেয়েছে সাদিয়ার বিরহে। তার মনটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। এই জীবনের মায়া- মমতা তার কাছে এখন আর নেই । জীবনটা এখন ধুধু মরুভূমি। একেবারেই নস্যি মনে হচ্ছে তার কাছে। বেঁচে থাকতে তার ভালো লাগছে না । কাছের মানুষগুলোকে আজ ভীষণ রকম দূরের মনে হচ্ছে । আপনজনদের মনে হচ্ছে দারুন ভাবে পর । তার নিজের উপর বেশ রাগ হচ্ছে । পাড়া পড়শী সবাইকে কীভাবে মুখ দেখাবে ভেবে পাচ্ছে না । আর ওদিকে চিরশত্রু শয়তান তো আছেই। সে সদা অন্তরে কুমন্ত্রণা দিয়ে বেড়ায় । এক পর্যায়ে আকাশ সিদ্ধান্ত নেয় এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাবে। কার জন্য বেঁচে থাকবে? এখন সবাই তাকে নিয়ে মজা করবে । এই পৃথিবীতে তার মূল্য বলতে কিছুই নেই । সে আত্মহত্যা করবে এ সিদ্ধান্তের উপর অটল। ডিপ্রেশন আর সহ্য করতে পারছে না। এই বসুন্ধরার সবকিছু তার কাছে পর পর মনে হচ্ছে। সবাই তাকে ধিক্কার জানাচ্ছে। বেঁচে থাকার যে একটা ঐকান্তিক ইচ্ছা এটা আর তার মাঝে বেঁচে নেই। সে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাবে অচেনা কোনো একদেশে, যেখানে তাকে কেউ চিনবে না। তিক্তকথা কখনো কবে না ।দিবে না কেউ কোনো কষ্ট । শুনতে হবে না তার মা-বাবার তীক্ষ্ণ পীড়াদায়ক কথার আঘাত। ভুলে থাকতে পারবে সাদিয়ার ভালোবাসার কথা ।
বাকিটা পরের পর্বে ।ইনশাআল্লাহ .....
