সূচিপত্র

    ইসলামের সৌন্দর্য


     প্রিয়, সত্যি কথা বলছি, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলামে জাগতিক ও পারলৌকিক ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয় খুব গুরুত্বের সাথে  দৃষ্টি রেখেছে। আমরা মনে করি ইউরোপ, আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালি পশ্চিমা বিশ্ব কত সভ্য জাতি, কত রূপ লাবণ্য জৌলুসতা আছে তাদের সভ্যতায়। আমি তোমাকে বলবো, তুমি যদি ইতিহাস অধ্যয়ন করো তাহলে তোমার কাছেই বিষয়টা প্রতিভাত হয়ে যাবে যে, তাদের অবস্থা কত বেখাপ্পা, নাজেহাল ও তমসাচ্ছান্ন ছিল। তাদের মাঝে কত কুসংস্কার ও অধার্মিক রীতি বিদ্যমান ছিল। তারা তো সবেমাত্র কিছুকাল পূর্বে সভ্য হয়েছে । আর এটাও সাধিত  হয়েছে মুসলিমদের সত্যতা সংস্কৃতি ছিনতাইয়ের বদৌলতে। কিছু নামে মাত্র মুসলিম ইউরোপ ঘুরে এসে গল্পের পসরা বসায়। তাদের প্রশংসা করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। 'আহ কত সুন্দর তাদের রাস্তাঘাট! গগনচুম্বী বিশাল বিশাল দালাল, অট্টালিকা সারি সারি  দাঁড়িয়ে আছে! কত নান্দনিক, চিত্তাকর্ষক অঙ্কনে মোড়ানো প্রাসাদগুলো! প্রকৃতি কত মনোরম মনোমুগ্ধকর , কোলাহলমুক্ত! মনের অজান্তেই তনুমন শিহরিত হওয়ার মতো স্থান! আর আমাদের মুসলিম দেশগুলোর কী ক্ষেত অবস্থা! যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তূপ, রাস্তাঘাটের কী বেহাল দশা। মনটাকে একটু চাঙ্গা করার জন্য নেই  কোলাহলমুক্ত নির্জন জায়গা। কী এক বিদঘুটে দেশে বসবাস করিরে আমরা!' অনেক ভাইয়ের কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই শুনতে পাই। হিন্দুরা কত পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন পরিপাটি! প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠেই তারা ঘরদোর গুছিয়ে মনোরম করে রাখে! তাদের বাড়ির আঙ্গিনার আশপাশ কত পরিচ্ছন্ন! বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানান রংয়ের নানান প্রজাতির হরেক রকম ফুল -ফলের দৃষ্টিনন্দন বাগান! তারা তাদের দোকানপাট খোলেই সবকিছু সুচারুরূপে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। দোকানের সামনে দিয়ে যেন ধূলোবালির আস্তরণ না পড়ে এজন্য পানি ছিটায়! কত ধোয়া মুছা করে! তারা কত রুচিশীল! কত সভ্য! আর আমাদের কী অবস্থা! গাধা গরু যেমন খায় আর লেদায় আমাদের অবস্থা সেরূপ। নিজেকে কীভাবে সভ্য করা যায় এ নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র চিন্তাভাবনা নেই। ' প্রিয় ভাইদের এসকল কথার প্রত্যুত্তরে আমি বলবো, ভাই, ইসলাম সম্পর্কে তোমার ন্যূনতম জ্ঞান নেই। তুমি ইসলাম নিয়ে লেখাপড়া করোনি। ইসলামী জ্ঞানের আশপাশে ঘেঁষার সময় পাওনি। ইসলামী জ্ঞানের পরিধি যে কত  সর্বময় তা তুমি জানো না! ইসলামের সৌন্দর্য রূপ লাবণ্য জৌলুসতা কত যে হ্নদয়ঙ্গম তা আমাদের অধিকাংশের জ্ঞানের অগোচরেই রয়ে গেছে। ইসলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে পদচারণ করেছে। তোমার সাথে আজ এ বিষয়েই একটু কথা বলবো। তুমি বন্ধ চোখটা একটু খোল। দেখো, ইসলাম তোমাকে  তার সৌন্দর্য হাত উঁচিয়ে দেখাচ্ছে । নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

    "‏ الْفِطْرَةُ خَمْسٌ الْخِتَانُ، وَالاِسْتِحْدَادُ، وَنَتْفُ الإِبْطِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ ‏"‏‏.‏

    ' মানুষের স্বভাবগত বিষয় হলো পাঁচটি,খাতনা করা, নাভির নিচের পশম চেঁছে ফেলা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, গোফ ছাঁটা ও নখ কাটা।' ( বুখারী, হা/ ৬২৯৭) 

    দেখলে ইসলাম কত সভ্য? ইসলামের বিধান কত সুন্দর চমৎকার! মানুষের ঘায়ে যেন দুর্গন্ধ না থাকে এজন্য কত সুন্দর দৃষ্টি রেখেছে!  এখন তোমার কাছে এগুলোর খানিকটা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তুলে ধরছি। প্রথমে আসি খাতনার বিষয়টা নিয়ে। তুমি কী বলতে পারবে সর্ব প্রথম কার খাতনা করানো হয়? আচ্ছা থাক, চলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেই শুনি।


     ‏"‏ اخْتَتَنَ إِبْرَاهِيمُ بَعْدَ ثَمَانِينَ سَنَةً، وَاخْتَتَنَ بِالْقَدُومِ ‏"‏‏.‏ 

    ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আশি বছর বয়সের পর ‘কাদূম’ নামক স্থানে নিজেই নিজের খাতনা করেন।' (বুখারী, হা/৬২৯৮)

    এবার তো জানতে পারলে কে সর্ব প্রথম খাতনা করেছেন। 

    খাতনা করার হুকুমটা এবার জেনে নাও । খাতনা করা ওয়াজিব। যদিও অনেক বিদ্বান সুন্নাহ বলেছেন। কিন্তু ওয়াজিব হওয়াটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। এর কারণ হলো আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আদেশ করেছেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অনুসরণ করার জন্য।

    ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

    'অতঃপর আমরা তোমাকে একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের অনুসরণ করতে আদেশ করছি। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।' (নাহল, ১৬/১২৩)

    আর আমাদের আদেশ করেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ পালন করতে।


    আর তোমাকে আমরা বলেছি ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ৮০ বছর বয়সে খাতনা করেছেন। তাহলে বুঝা যাচ্ছে বিষয়টা কত গুরুত্বপূর্ণ! আমরা জানি নিজেকে কষ্ট দেয়া যাবে না। আর খাতনা করিয়ে নিজেকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে। এটা ওয়াজিব না হলে কখনোই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই আদেশ দিতেন না। খাতনা না করালে প্রস্রাব ভেতরে থেকে যায়। যার কারণে নাপাক ভেতরে থাকে।  আর নাপাক থেকে বিরত থাকার জন্য আমাদের বলা হয়েছে। নাপাক নিয়ে সালাত আদায় করলে সালাত হবে  না। এজন্যই খাতনা করা ওয়াজিব। 

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

     ‏"‏ أَلْقِ عَنْكَ شَعْرَ الْكُفْرِ وَاخْتَتِنْ ‏"‏ ‏.


     'তুমি কাফের অবস্থার চুল ফেলে দাও ও খাতনা করে নাও।' (আবু দাউদ, হা/৩৫৬) 

     আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি বলবে নারীদেরও কি খাতনা করাতে হবে? যেমন কিছু হাদীসে পাওয়া যায়। এমনিভাবে বিধানের ক্ষেত্রে তো নারী পুরুষ সমান! তোমার প্রশ্নের উত্তর শুনো। পুরুষদের খাতনা করানো ওয়াজিব এটা পূর্বে তোমাকে বলেছি; কিন্তু নারীদের খাতনা করানো ওয়াজিব নয়। এটা দেশের আবহাওয়ার ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যে দেশে শীতের প্রার্দুভাব বেশি যেমন: বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, কাশ্মীর, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশ। ওই দেশের নারীদের খাতনা করানোর প্রয়োজন নেই। কারণ তাদের ভগাঙ্কুর এমনিতেই ছোট থাকে । আর নারীদের ভগাঙ্কুর বড়  থাকলে  কাটতে হয়। আর যে সকল দেশে উষ্ণতার প্রার্দুভাব বেশি যেমন: সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, দুবাই, উমান, ইয়েমেন, মিশর ও আফ্রিকার দেশগুলো। ওই দেশের নারীদের খাতনা করাতে হয়। কারণ উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে তাদের ভগাঙ্কুর বড় হয়ে থাকে। তাই এটাকে কেটে ছোট করতে হয়। আর এ কথাই বলেছেন নাসিরউদ্দিন আলবানী রহিমাহুল্লাহ ফাতাওয়া আলবানীতে।

     (ফাতাওয়ায়ে আলবানী, পৃঃ ১৭৪) 

     আমি এখানে আরো একটু কথা বৃদ্ধি করছি। অনেক নারী মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করে থাকে, 'নাক কান ছিদ্র করা যাবে কিনা'। যেহেতু তারা নাকের ফুল ও কানের দুল তাতে পড়ে থাকে। কিছু নারী তো আরেকটু কৌতূহলী হয়ে বলে, 'এক কানে একাধিক ছিদ্র করা যাবে কিনা'। তাদের উত্তরটা এখানে দেয়া সমীচীন মনে করছি।  নারীদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শোভা সৌন্দর্য বর্ধন করা, পরিপাটি হয়ে থাকা, সাজসজ্জা করা। প্রতিটি নারীই সাজুগুজু করতে ভালোবাসে। এজন্যই তুমি দেখতে পাবে তোমার আশপাশে  ছোট্ট মেয়েটা বা ভাতিজিটা মিছামিছি লেখনার সামগ্ৰী নিয়ে ভাত, তরকারি রান্না করে, শাড়ি পরিয়ে সাজুগুজু করে পুতুলের বিয়ে দেয়। খেলনার কসমেটিক নিয়ে সাজে। আরো নারী সূলভ কত কী করে। তুমি কিন্তু তোমার ছেলের মাঝে বা ভাতিজার মাঝে এই বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করো না। কারণ মহান রব নারীদের সৃষ্টিই করেছেন এই ধাঁচে। নারীরা যেহেতু সাজুগুজু প্রেমিক আর নাক কানে ফুল ও দুল পরিধান করা হলো সাজুগুজুর বহিঃপ্রকাশ, সেহেতু তারা নাক কানে ফুল ও দুল পরিধান করতে পারবে। এমনকি এক কানে একাধিক ছিদ্র করে দুল পরিধান করতে পারবে। নারী সাহাবীরা নাকে ফুল ও কানে দুল পরিধান করতেন। আচ্ছা তোমাকে প্রমাণ দিয়ে বলছি। ইবনু আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন,

       خَرَجَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَصَلّٰى ثُمَّ خَطَبَ  ثُمَّ أَتٰى النِّسَاءَ فَوَعَظَهُنَّ وَذَكَّرَهُنَّ وَأَمَرَهُنَّ بِالصَّدَقَةِ فَرَأَيْتُهُنَّ يَهْوِينَ إِلٰى آذَانِهِنَّ وَحُلُوقِهِنَّ يَدْفَعْنَ إِلٰى بِلاَلٍ ثُمَّ ارْتَفَعَ هُوَ وَبِلاَلٌ إِلٰى بَيْتِهِ.

    ' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হলেন। তারপর সালাত আদায় করলেন, এরপর খুৎবাহ দিলেন।  এরপর তিনি মহিলাদের কাছে এলেন এবং তাদেরকে ওয়াজ ও নাসীহাত করলেন ও তাদেরকে সাদাকাহ করার আদেশ দিলেন। আমি দেখলাম, তারা তাদের কর্ণ ও কন্ঠের দিকে হাত প্রসারিত করে (গয়নাগুলো) বিলালের কাছে অর্পণ করছে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও বিলাল (রা) গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন।' (বুখারী, হা/ ৫২৪৯)


    এই হাদীসে তুমি দেখলে নারীরা কান থেকে গহনা খোলে বেলালের হাতে দিচ্ছে। তাদের কান যদি ছিদ্র করা না থাকতো তাহলে কোথায় কানের দুল পরিধান করেছে? অতএব, বুঝা যাচ্ছে তারা কান ছিদ্র করতো।  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

     ‏ "‏ طِيبُ الرِّجَالِ مَا ظَهَرَ رِيحُهُ وَخَفِيَ لَوْنُهُ وَطِيبُ النِّسَاءِ مَا ظَهَرَ لَوْنُهُ وَخَفِيَ رِيحُهُ ‏"‏ ‏.‏


     'পুরুষের সুগন্ধি এমন হবে যার সুগন্ধ প্রকাশ পায় কিন্তু রং গোপন থাকে এবং নারীর সুগন্ধ এমন হবে যার রং প্রকাশ পায়; কিন্তু  সুগন্ধ গোপন থাকে।' (তিরমিজী হা/২৭৮৭)

      নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীসে নারীদের শোভার কথা বলেছেন। আর তা হলো যার রং দেখা যায়। নাকের ফুল ও কানের দুলও দেখা যায়। সুতরাংনারীরা নাক কান ছিদ্র করতে পারবে। এমনকি একাধিক ছিদ্র করাও জায়েজ আছে। 

       কিছু তরুণ কে দেখতে পাই তারা নারীদের ন্যায় কান ছিদ্র করে ‌। একা সম্পূর্ণ হারাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষদের নিষেধ করেছেন নারীদের বেশ ধারণ করতে। এমনকি তিনি অভিসম্পাত করেছেন।

       لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ‏.‏ 


    'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইসব পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন, যারা নারীর বেশ ধরে ও ওইসব নারীকে, যারা পুরুষের বেশ ধরে।' (বুখারী,হা/৫৮৮৫)


    তারপর তোমার সাথে কথা হলো কখন খাতনা করাতে হবে ‌‌। বালেগ হলে নাকি এর আগেই? কিছু বিদ্বান বলেছেন, বালেগ হলে খাতনা করাতে হবে। এর আগে নয়। তাদের যুক্তি হলো, সালাত সিয়াম ও ইসলামের বিধান তো মূলত আবশ্যক হয় বালেগ হওয়ার পর, আগে নয়। তাই বালেগ হওয়ার পর খাতনা করাতে হবে। আর কিছু বিদ্বান বলেন, বালেগ হওয়ার আগে করাতে হবে। তাদের প্রমাণ হলো।

    عقَّ رسولُ اللهِ ﷺ عن الحسنِ والحسينِ وختنهما لِسبعةِ أيامٍ.

    'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইনের পক্ষ থেকে আকীকা করেন এবং সপ্তম দিন খাতনা করান।' (আবু ইয়ালা, হাদীসের সনদ দুর্বল হা/১৯৩৩)


    তাদের এই হাদীস দুর্বল। তবে এর উপর আমল রয়েছে। আমরা মনে করি বাচ্চার খাতনা করানোর নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তবে ছোটকালে করালেই ভালো হয়। কারণ এই বয়সে বাচ্চার চামড়া পাতলা থাকে, যার ফলে কষ্ট কম হয়। আর বালেগ হওয়ার পর খাতনা করানো মাকরুহ। ইবনুল কাইয়ুম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'প্রাপ্ত বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত খাতনা না করানো এটা অভিভাবকদের জন্য জায়েয নয়।' (ফাতাওয়ায়ে আলবানী, পৃঃ ১৭৪)

     প্রসঙ্গত একটা কথা বলি, অনেকেই অনর্থক একটা প্রশ্ন করে জ্বালাতন করে। বলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কখন খাতনা করানো হয়। বাধ্য হয়ে তাদের এই অনর্থক প্রশ্নের উত্তর দিলাম। এ ব্যাপারে তিনটা মত রয়েছে।

     (১)  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাতনা করা অবস্থায় জন্ম গ্ৰহণ করেছেন। এ মতের পক্ষে যত হাদীস আছে সব নিতান্তই দুর্বল। তাই এটা সঠিক মত নয়।

     (২) হালিমা সাদিয়ার গৃহে থাকাকালীন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বুক চিরার সময় জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তার খাতনা করান। এ মতের পক্ষেও যত হাদীস আছে সব নিতান্তই দুর্বল। তাই এ মতও সঠিক নয়।

     (৩) আরবের রীতি অনুসারে সপ্তম দিন তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব খাতনা করান। এ মতটিই শক্তিশালী ও সঠিক। ইবনুল কাইয়ুম রহিমাহুল্লাহ তুহফাতুল মাওলুদ ও যাদুল মায়াদে এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। 

     তোমার সাথে আমার পরের কথা হলো খাতনা করালে যদি কারো সমস্যা হয়। যেমন: ডাক্তার বলেছেন, খাতনা করালে রক্ত পড়া  বন্ধ হবে না তাহলে এ ক্ষেত্রে খাতনা না করালে কোনো সমস্যা নেই। কারণ এখানে প্রাণনাশের সম্ভবনা রয়েছে। আল্লাহ বলেন,

     وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

     'তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। অনুগ্ৰহ করো, নিশ্চয় আল্লাহ অনুগ্ৰহশীলদের ভালোবাসেন।'  (বাকারা, ২/১৯৫)


    وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا

    'তোমরা নিজেদের হত্যা করো না।নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।'  (নিসা, ৪/ ২৯)


    يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

    'আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।' (বাকারা, ২/১৮৫)


    فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ 

    'তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।' (তাগাবুন, ৬৪/১৬)

    রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

     وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ ‏"‏‏.‏


     'যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের আদেশ করি তাহলে সাধ্যানুযায়ী তা মেনে চলবে।'  (বুখারী, হা/৭২৮৮)

     

    তুমি ঘুমিয়ে আছো। গভীর ঘুমে বিভোর। কী জানি নিয়ে স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করছো। হঠাৎ তোমার মা ডাক দিলো। এই, উঠ তাড়াতাড়ি। পাশের বাড়ির অমুকের ছেলের ঘুমের মধ্যেই খাতনা (মুসলমানী) হয়ে গেছে। তুমি ঘুম বাদ দিয়ে হুড়মুড় করে তাদের বাড়িতে গেলে। গিয়ে দেখলে ঘটনা সত্যই। এখন তোমার মনে প্রশ্ন এসে ভিড় জমাল 'এই ছেলেকে কি পূণরায় খাতনা করাতে হবে '? আমার কাছ থেকে শুনো। এই ছেলেকে আর পূণরায় খাতনা করাতে হবে না। কারণ তার তো খাতনা হয়েই গেছে। তবে যদি  পরিপূর্ণ খাতনা না হয়ে থাকে তাহলে ভালো করে খাতনা করাবে।  শাফী মাজহাবের কিছু বিদ্বান বলেন, কারো  খাতনা হয়ে গেলে লজ্জাস্থান কাটা বাদ দিয়ে  ছুরি এমনিতেই চালাবে। কিন্তু এ কথার পেছনে বিশুদ্ধ দলীল নেই। (ফাতহুল বারী, ১৩খন্ড, পৃঃ ৩৩০ হা/ ৫৮৮৮)

    এক নাস্তিকের প্রশ্নের উত্তর। ফেইসবুকে লাইভে এক নাস্তিক এসে বলছে, তোমাদের আল্লাহ কুরআনে বলেছে, 

    لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ

    'আমরা মানুষদের সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছি।' (তীন, ৪) 

    মানুষ কে যদি সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে আবার খাতনা করিয়ে সুন্দর করতে হয় কেন? একটা কথা ভালো করে স্মরণ রাখবে। নাস্তিকদের কাজেই হলো ইসলামের বিধান নিয়ে সমালোচনা করা। তারা আসলে নাস্তিক নয়; তারা ইসলাম বিদ্বেষী। তারা তো ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করে না। তাদের উত্তরটা শুনো। যে আল্লাহ আমাদের সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। আমরা তার আদেশেই এই সুন্দরটা কাটি। আমাদের কাজই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মান্য করা। ইবলীসের মতো আমরা তর্ক করবো না। মুমিনদের কাজ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা শুনার সাথে সাথে তা বাস্তবায়ন করা। যেমনটা করেছেন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম । 

    কোনো ব্যক্তি যদি ইসলাম গ্ৰহণ করে তাহলে তারও কি খাতনা করাতে হবে? হ্যাঁ, তারও খাতনা করতে হবে। এক ব্যক্তি ইসলাম গ্ৰহণ করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন,

    "‏ أَلْقِ عَنْكَ شَعْرَ الْكُفْرِ وَاخْتَتِنْ ‏"‏ ‏.


     'তুমি কাফের অবস্থার চুল ফেলে দাও ও খাতনা করে নাও।' (আবু দাউদ, হা/৩৫৬) 

      তবে যদি বড় হওয়ার কারণে খাতনা করালে সমস্যা হয় তাহলে খাতনা না করালেও চলবে। আল্লাহ বলেন,

    فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ 

    'তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।' (তাগাবুন, ৬৪/১৬)

    মৃত ব্যক্তির যদি খাতনা করানো না থাকে তাহলে তাকে আর খাতনা করাতে হবে না ‌ । কারণ মৃত্যুবরণ করার কারণে তার থেকে দায়িত্ব উঠে গেছে। তাই জীবিত ব্যক্তিদের তার আর খাতনা করানোর প্রয়োজন নেই। 

    তোমার তো খাতনা করানো শেষ হয়ে গেছে। তো খাতনাকারীকে পারিশ্রমিক দিতে হবে না? হ্যাঁ, খাতনাকারীকে অবশ্যই পারিশ্রমিক দিতে হবে, যেমন অপারেশনকারীকে পারিশ্রমিক দিতে হয়। কারণ খাতনা করানোটাও একটা অপারেশন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,


     ‏ "‏ أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ ‏"‏ ‏.‏ 

      'শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকানোর পূর্বেই  তার মজুরী দাও'।  ( ইবনে মাজাহ, হা/ ২৪৪৩)

    তুমি তোমার আশপাশে সপ্তাহখানেক বাদে বাদেই দেখতে পাবে খাতনার (মুসলমানীর) জাঁকজমকপূর্ণ ভোজন অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই শুরু হয় নাচ গান। নারী - পুরুষের অবাধ মেলামেশা। অনেক জায়গায় চোখের ও মুখের জিনার প্রসরা সাজিয়ে বসে। রাতভর আনন্দ উল্লাস, হৈ হুল্লোড় করে মানুষের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে কষ্ট দেয়। শুক্রবার দিন কাচের একটা সাদা জগ, এক বক্স টিস্যু ও পান সুপারি রেখে ব্যবসা শুরু করে। এ ধরনের খাতনার অনুষ্ঠান কি বৈধ ও সেই অনুষ্ঠানে কি অংশ গ্ৰহণ করা বৈধ হবে? 

    উত্তরটা শুনো। এ ধরনের অনুষ্ঠান করা বৈধ নেই। এর কয়েকটি কারণ দেখো। এ সকল অনুষ্ঠানে সম্পদের অপচয় হয়। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন,

    يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

    'হে আদম সন্তান! মসজিদে গমনকালে সাজসজ্জা গ্ৰহণ করো। পানাহার করো, তবে অপচয় করবে না। নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) অপচয় পছন্দ করেন না।' 

    (আরাফ, ৭/ ৩১)


    إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا 

    'নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তো তার রবের অকৃতজ্ঞ।'  (ইসরা, ১৭/২৭)


    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

     ‏ "‏ إِنَّ اللَّهَ كَرِهَ لَكُمْ ثَلاَثًا قِيلَ وَقَالَ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ ‏"‏‏.‏

    ' আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন, (১) অনর্থক বেশি বেশি প্রশ্ন করা, (২) সম্পদ নষ্ট করা ও (৩) অত্যধিক (মানুষের কাছে) চাওয়া ।'  (বুখারী, হা/ ১৪৭৭)


    এ সকল অনুষ্ঠানে জিনা ব্যভিচারের রুদ্ধ পথ খুলে যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রেম ভালোবাসার সূত্রপাত ঘটে। আর আল্লাহ ব্যভিচার থেকে বহুদূরে থাকতে আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,

    وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا 

    'তোমরা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যাবে না। নিশ্চয় এটা অশ্লীলতা ও মন্দ পথ।' (ইসরা, ১৭/৩২)


    চোখের জিনা হরহামেশা হয়। চোখ সংযত রাখা দুস্কর। আল্লাহ বলেন,

    قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ

    ' (হে নবী) মুমিনদের বলো, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে‌ । এটা তাদের জন্য পবিত্রতা। নিশ্চয় আল্লাহ তোমরা যা করো তার খবর রাখেন ‌।' (নূর, ২৪/৩০)


    وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ


    '(হে নবী) মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করে‌ ।' (নূর, ২৪/৩১)

    এ সকল খাতনার অনুষ্ঠানে তুমি ভুলেও যাবে না। কারণ গেলে তুমি মন্দ কাজে সহযোগিতা করলে। আর আল্লাহ আমাদের মন্দ কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন।

    وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ  

    'কল্যাণ ও আল্লাহ ভীতির কাজে একে অপরকে  সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্গনের কাজে সহযোগিতা করবে না।' (মায়েদা, ৫/২) 

    এখন কথা হলো কেউ যদি এভাবে অনুষ্ঠান না করে এমনিতেই আত্মীয় স্বজনদের খাওয়ায় তাহলে এই অনুষ্ঠান করা বৈধ আছে ও এ সকল অনুষ্ঠানে যাওয়া যাবে। ইবনু কুদামা রহিমাহুল্লাহ মুগনী কিতাবে বলেন, 'খাতনার অনুষ্ঠান করে এমনিতেই আত্মীয় স্বজনদের খাওয়ানো যাবে।' ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ কে খাতনার অনুষ্ঠানে দাতয়াত করলে তিনি সেখানে যান। (ইসলামীক ওয়েব, ইনফু ও দুরার নেট)  সুতরাং আমাদের বোধগম্য হলো যে কেউ যদি অপচয়, অশ্লীলতা ও গান বাজনা পরিহার করে এমনিতেই আত্মীয় স্বজনদের খাওয়ায় তাহলে এই অনুষ্ঠান করা বৈধ আছে ও এই অনুষ্ঠানে যাওয়া যাবে। আল্লাহ আমাদের সুবোধ দান করুন আমীন।

    Next Post Previous Post
    No Comment
    Add Comment
    comment url